Friday, 12 July 2013

অ্যালবাম ৩



সম্ভবত ১৯৯৪ সাল। জ্যাক শিরাখ তখন প্যারিসের মেয়র, আর কয়েক মাস পরই  ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, বারো বছর  প্রেসিডেন্ট ছিলেন।  তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন  হোটেল দ্য ভিলে (সিটি হলে/ টাউন হলে), মেয়রের অফিসে। অফিস তো নয়, যেন প্রাসাদ।   আমাকে খুব অমূল্য এক সম্পদ তিনি উপহার দিয়েছিলেন,  ধর্ম নিয়ে লেখা ফরাসী   দার্শনিক ভলতেয়ারের পাঁচখানা বই। প্রথম প্রকাশ। রেক্সিন বাঁধাই। প্রকাশের বছর, সতোরোশ সামথিং।   সুইজারল্যাণ্ড থেকে বেরিয়েছিল বইগুলো। এর চেয়ে বড় উপহার জানি না কিছু পেয়েছি কি না জীবনে ! ভলতেয়ার   মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে জীবনভর লড়েছিলেন। অসহিষ্ঞুতা, ধর্মান্ধতা আর সরকারি অরাজকতার কঠোর সমালোচনা করতেন। রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার পক্ষে মানুষকে সচেতন করেছেন!  প্রচুর বই লিখেছেন। জেল হয়েছে। নির্বাসন হয়েছে।



গত কুড়ি বছর এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক শহর থেকে আরেক শহর করতে বাধ্য হয়েছি। আর কত যে পুরস্কার হারিয়েছে। কত যে পদক, কত যে মেডেল আর সার্টাফিকেট! কিন্তু জানি না কী কারণে ভলতেয়ারের বইগুলো এখনও রয়ে গেছে।  বইগুলো আছে, এটিই স্বস্তি দেয়। যেন ভলতেয়ার আছেন পাশে। বেঁচে থাকলে পাশেই তো থাকতেন।         


যেবার জ্যাক শিরাখ ভলতেয়ারের বই উপহার দিলেন আমাকে, সেবারই দেখা হয়েছিল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরোঁর সঙ্গে। এলিজে প্যালেসে। এলিজে  প্যালেস প্রেসিডেন্টের বাসভবন। বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছিল  মিতোরোঁর সঙ্গে। অত বড় মানুষের সঙ্গে কী আর বলতে পারি! রাজনীতি নিয়ে মিতেরোঁর সঙ্গে? তবে বলেছি কিছু, বাংলাদেশের নষ্ট পচা রাজনীতি নিয়েই কিছু বলেছি। ইংরেজি বলতে জানেন, কিন্তু তারপরও দোভাষী রেখেছিলেন। অফিসিয়াল মিটিংএ তাই করেন ওঁরা। 
কিন্তু আমার সঙ্গে অফিসিয়াল হওয়াই বা কেন! আমি তো কোনও দেশের প্রতিনিধিত্ব করিনি। বরং দেশহীন রাষ্ট্রহীন একজন মানুষ তখন আমি। লেখক বলে সম্মান করেছেন ওঁরা। শিল্পী সাহিত্যিকদের সম্মান বড় মানুষেরা করেন। আর ছোটলোকেরা তাদের বই নিষিদ্ধ করে, তাদের ছবি আঁকা নষ্ট করে দেয়, তাদের নাটক সিনেমা বন্ধ করে দেয়, তাদের দেশ ছাড়া করে, তাদের জেলে পোরে, মেরে ফেলে।







ফ্রান্সের শিক্ষা-সংস্কৃতি মন্ত্রী তখন জ্যাক তুবোঁ। তাঁর সঙ্গেও দীর্ঘক্ষণ মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কী স্বচ্ছ ধারণা রাখেন মানবাধিকার সম্পর্কে। দক্ষিণ এশিয়ার   ক’জন রাজনীতিক রাখে এমন  জ্ঞান।  



সে বছরই ইওরোপীয়ান পার্লামেন্ট থেকে দেওয়া হয়েছিল মুক্তচিন্তার জন্য শাখারভ পুরস্কার। পুরস্কার দিচ্ছিলেন আমাকে ইওরোপিয়ান পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট ক্লাউস হান্স। 



পুরস্কার অনুষ্ঠানের আগে আমাকে সোশালিস্ট পার্টি থেকে সম্বর্ধনা দেওয়া হল। ওঁরাই নাকি আমার নাম প্রস্তাব করেছিলেন শাখারভ পুরস্কারের জন্য। আমার সঙ্গে হাঁটছেন পার্লামেন্টের সোশালিস্ট পার্টির নেতা পোলিন গ্রীন। তিনি ইংলিশ।



শাখারভ পুরস্কারটি হারিয়ে যায়নি এখনও, আছে। কিন্তু জীবন আমার এখনও পথে পথে। এখনও কোনও ঘর নেই কোথাও। হারিয়েই হয়তো একদিন যাবে সব। তারপরও ভাবি, এসব হিরে সোনা, এসব মেডেল সার্টিফিকেটের কী মূল্য জীবনে! সব কিছু রেখেই তো চলে যেতে হবে। সব ধুলোয় গড়াবে। যা কিছু সহায় সম্পদ, দেশে বিদেশে পড়ে থাকা আমার সংগ্রহের প্রায় পঞ্চাশ  হাজার বই, শখের বই, সব ধ্বংস হবে, জানি। হোক। গোটা পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষ বলে কিছুর অস্তিত্বই থাকবে না একসময়।  






জীবনের অনেকটা পথ হেঁটে এই টুকু জানি, জীবনের শেষঅবধি সবচেয়ে যে জিনিসটা থেকে যায়, সবচেয়ে যে জিনিসটা মূল্যবান, তা হল মানুষের ভালোবাসা। ভিড় করে এক পলক যারা দেখতে আসতো, যারা ভালোবাসতো, যারা বলতো তোমাকে দেখলে, তোমার কথা শুনলে, তোমার বই পড়লে শক্তি পাই, সাহস পাই, তুমি যেন কখনও লেখা ছেড়ো না, তোমার লেখা আমাদের বাঁচায়, তাদের ভুলতে পারিনি। পুরস্কারগুলো মলিন হয়ে যেতে থাকে।  ভালোবাসাটা টগবগ করে জীবনভর।  একটা কবিতা লিখেছিলাম তখন।

  

ফ্রান্সে আমাকে বারোশো পুলিশ ছিল ঘিরে,
পেতেছিল লাল গালিচা রাজ্যপালেরা,
শহর উপচে পড়েছিল কোটি দর্শকে,
রাজা মন্ত্রীও দাঁড়িয়েছিলেন মহাউৎসবে ভিড়ে।

ঘর ছিল ভরা ফুলে আর উপহারে
কে আগে আমাকে সোনার মেডেল দেবে
তাই নিয়ে ছিল সভ্য লোকের লড়াই।
মাঝখানে আমি নাস্তানাবুদ অভিনন্দন-ভারে।

রাজা মন্ত্রীর পেছনে দাঁড়িয়ে একা,
ফরাসি একটি তরুণী কাতর চোখে
বলেছিল তুমি একা নও, আমি আছি।
ইচ্ছে আমার তাকেই হয়েছে বারবার ফিরে দেখা।


2 comments:

  1. Didi,
    Aapnar lorai, aapnar safolyo...
    aamake baNcte sekhai...
    Sustho thakun...
    Bhalo Thakun...

    Nandini

    ReplyDelete
    Replies
    1. @Nandini C
      guni pathoker moner katha tomar lekhay fute uthlo. 'Taslima Nasreen' naam tai emon shoktishali, jeta kothin somoye barbar nijeke bolle, montrer mot kaj hoy...hotashar ondhokar kete giye apnei ek alokito vor fute othe...kintu onnodike Naam tar eto ojon je Banglar (Pathok noy, ekta rajjo o proshashon hisebe) khomota holo na eke buke dhore rakhte..dukkho ta ekhanei.

      Delete