Sunday, 7 July 2013

কেন লিখি?






  ছোটবেলায় আমাদের দু ধরনের  খাতা থাকতো,   রাফ খাতা, আর  ফেয়ার খাতা। ফেয়ার খাতায় কোনও হাবিজাবি লেখা চলবে না। রাফ খাতায় চলবে। রাফ খাতায় থাকতো আমার রাজ্যির হাবিজাবি। যে কোনও লেখাই রাফ খাতায় আগে   প্র্যাকটিস করে পরে তবেই ফেয়ার খাতায় লিখতাম।  রাফ খাতা ছিল স্বাধীনতা, ফেয়ার খাতা ছিল থমথমে একটা পরাধীনতা। রাফ  খাতার মার্জিনে বা   মাঝখানে, অংক করতে গিয়ে, বা    নানা রকম ‘বাড়ির কাজ’  প্র্যাকটিস করতে  গিয়ে কত যে মনের কথা লিখেছি তার কোনও হিসেব নেইবছর শেষ হলে নতুন ক্লাসে উঠলে পুরোনো বই-খাতা সের দরে বিক্রি করে দেওয়া হত, আর বিক্রি না হলেও ওসব বাঁচিয়ে রাখা যেতো না,  উইপোকা খেয়ে ফেলতো। লেখার হাতেখড়ি আমার রাফ খাতায়। 

একসময় গোটা একটা রাফ খাতাকে   ‘লেখার খাতা’ই করে ফেললাম। ও নিয়ে ইস্কুলের লেখাপড়ার চেয়েও বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। খাতাটা বাবা মার চোখের আড়ালে রাখতে হত। তবে লুকিয়ে  ইস্কুলে নিতাম খাতাটা ক্লাসের মেয়েরা কাড়াকাড়ি করে গোগ্রাসে পড়তো আমার লেখা।  একসময় ওরা বাড়িতে নিয়ে যেতে শুরু করলো খাতা, পড়া শেষ হলে ফেরত আনতো, তখন আরেকজন পড়তে নিত।  যার খাতা তার হাতে আসতে আসতে মাস চলে যেতো। দাদারা কবিতা-পত্রিকা বার করতো, বাড়িতেই পত্রিকা ভাঁজ করে করে পোস্ট করা হতো গ্রাহকদের ভাঁজে অংশ নিতাম, মুখস্ত করে ফেলতাম ছাপা হওয়া কবিতাগুলো। ওসবে  দাদারা কবিতা লিখতো। তখনও   কবিতা ছাপানোর মতো বয়স আমার হয়নি। 
 
তবে বয়স   হওয়ার আগেই আমার লেখা শুধু দাদাদের পত্রিকায় নয়, শহরের, এমনকী শহরের বাইরের লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা হতে শুরু করলো, এমনকী জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হলো বেশ কিছু আর বয়স হওয়ার আগেই, যখনও বাড়ির চৌকাঠ আমার ডিঙোনো নিষেধ, কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা আর প্রকাশনা দুটোই শুরু করলাম। তখন সবে সতোরো  আমি। 

সেই যে লেখার শুরু। আজও চলছে সেই লেখা। মাঝখানে  গেল মেডিক্যাল কলেজের কঠিন পড়াশোনা, হাসপাতালের চাকরি—লেখার গতি কমেছে, কিন্তু লেখা ছাড়িনি। কেন ছাড়িনি, ছাড়তে পারিনি বলেই ছাড়িনিকারণ যে কথা মনে আনাগোনা করে, সে কথা   অন্য আর কোনও কিছু করে  প্রকাশ করতে আমি পারিনা। আমি না জানি গান গাইতে, না জানি নাচতে। আমি না পারি     নাটক করতে, না পারি  ভালো  ছবি আঁকতে। শুধু লেখাটাই জানি। লেখাতেই বলতে পারি কী বলতে চাইছি। যা লিখে বোঝাতে পারি, তা বলে বোঝাতে পারি না।  বলতে গেলে সব তালগোল পাকিয়ে যায়। 


মনে কী এমন কথা আমার যা প্রকাশ করতেই হবে? না, মনে  নতুন   কোনও বৈজ্ঞানিক  তত্ত্ব নেই,  গ্রহ নক্ষত্র আবিস্কারের  গোপন কোনও পরিকল্পনাও  উঁকিঝুঁকি  দিচ্ছে না।    খুব সাধারণ কিছু কথা মনে, না বললে আর সব মেয়েদের মতো চিরকালই   কথাগুলো বুকের ভেতর পুষে রাখতে হবে। সাধারণ কথা, আমি কী চাই, কী না চাই, আমার কী ভালো লাগে, কী ভালো লাগে না, এসব।  পুরুষেরা বলে। বেশির ভাগ মেয়েরাই বলে না, কারণ মেয়েদের অত কথা বলতে নেই, অত চাওয়া থাকতে নেই, অত নিজস্বতা থাকতে নেই, অন্যের ভালোয় মেয়েদের ভালো।  

কিন্তু যেহেতু আমি বিশ্বাস করি না মেয়ে বলে আমি কিছুটা ‘কম মানুষ’, যেহেতু বিশ্বাস করি না অধিকার বা স্বাধীনতা আমার কিছুটা কম হলেও চলে, তাই বলি, তাই লিখি, সময় সময় চেঁচাই। লিখি কেবল আমার জন্য নয়, লিখি তাদের জন্যই বেশি,   যাদের  জানতে দেওয়া হয় না  কতটা অধিকার তাদের আছে নিজের জীবনটা নিজের পছন্দমতো যাপন করার। লিখে   সেই মেয়েদের, সেই মানুষদের স্থবির জীবনে যদি সামান্যও তরঙ্গ তুলতে পারি, তবেই  আমার লেখা সার্থক। সার্থক হই বলেই আর যা কিছুই ছাড়তে পারি, লেখাটা পারি না।

9 comments:

  1. অনেক দিন পর পর 'মুক্তচিন্তা'য় নতুন লেখা পড়তে পারি । আরেকটু বেশি পেলে ভালো লাগবে।

    ReplyDelete
  2. আপনার লেখা আবার পরছি, ভালো লাগছে ... কেন যে আপনার ব্লগ তা আগে খুঁজে পেলাম না!!!

    ReplyDelete
  3. বাহ ! খুব সুন্দর ! আপনার লেখাআমাকেও প্রেরণা দেয ।

    ReplyDelete
  4. ছোট ছোট কথা তবু বেশ অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ । আপনি লিখুন, লিখতে থাকুন, আপনার লেখের জন্যে অনেক পাঠক অপেক্ষা করে থাকেন ।

    ReplyDelete
  5. ''লিখি কেবল আমার জন্য নয়, লিখি তাদের জন্যই বেশি,যাদের জানতে দেওয়া হয় না কতটা অধিকার তাদের আছে নিজের জীবনটা নিজের পছন্দমতো যাপন করার। লিখে সেই মেয়েদের, সেই মানুষদের স্থবির জীবনে যদি সামান্যও তরঙ্গ তুলতে পারি, তবেই আমার লেখা সার্থক।" ---- না গো ! এই যে তোমার লেখা পড়ে, মানে বুঝে, কিছু চিন্তা করতে পারছি এতে সার্থক হয়েছে আমাদের মত 'শিক্ষিত' পাবলিক যারা পড়ার বই মুখস্থ করে গাদা গাদা নম্বর পেয়ে কেতাদুরস্ত চাকুরে হয়ে সমাজে ইয়া বড় প্রেস্টিজ হাঁকাচ্ছি! কিন্তু গ্রে-ম্যাটার থেকে নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে, থুড়ি, মনের নিজস্ব ইচ্ছে-টিচ্ছে, স্বপ্ন-টপ্ন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতেই ভয় পাই, তো লিখব কি ! তোমার এই ব্লগ, ওয়েবসাইট, ট্যুইট ইত্যাদি পড়ে বন্ধু মহলে অন্তত কিছু আনকোরা বিষয় নিয়ে গলাবাজী করে শান্তি পাই । তাই এই সুযোগ টুকু করে দেওয়ার জন্য 'ধন্যবাদ'-টা খুব ছোট কৃতজ্ঞতাসূচক শব্দ । তুমি আরো লেখ, আমরা সেগুলো নিদেন পক্ষে মুখস্থ করে নিজেদের রঙ্গিন প্রেস্টিজটা ধরে রাখি, কেমন ! ভালো থেক প্রিয় লেখক ।

    ReplyDelete
  6. sottie to tomar lekha amader jonyoi to. meye bela bole je kichu hoi tai to kokhono vebe uthte parini. kotota amar prapyo odhikar tai to jantam na jodi na ´nirbachito kolam´ na portam! jokhon hotasai dube jachilam tokhon tomar ei boita jeno chabuk mere dnar koria diyechilo. se chabuk e amar sirdnara soja hoyechilo,prerona peyechilam. tomar lekha regular pele bhalo hoi. ashai ashai thaki notun lekhar jonyo. prerona hoye theko. onek bhalobasa.

    ReplyDelete
  7. আপনার লেখা পরে কত মেয়ে যে নিজেদের অধিকার সম্পরকে সচেতন হয়েচে তা বলে শেষ করা যাবেনা। আমাদের ভালবাসা সব্সময় আপ্নার মংগল কামনা করে। আমি জানি আপ্নি আক্জন নিরভিক মানুষ। আপ্নাকে অনেক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা.. ভাল থাকুন সব্সময়।

    ReplyDelete