Sunday, 12 May 2013

আগুন নিয়ে কবিতা

অনেকদিন কবিতা লিখি না। না লিখতে লিখতে জীবন যেন কেমন গদ্যময় হয়ে উঠছে। দু'দিন আগে আগুন নিয়ে একটা কবিতা লিখলাম।


অগ্নি  


ক.
কাল রাতে হঠাৎ আগুন লেগেছিল ঘরে।
অনেকদিনের ঠাণ্ডা শরীর,
তাপ-উত্তাপ ভুলে যাওয়া ঠাণ্ডা শীতল শরীর,
না-স্পর্শ না-ছোঁয়া ঠাণ্ডা শরীর,
ওই শরীর কাল স্পর্শ করেছিল আগুন।

স্পর্শকে আসকারা দিলে যা হয়, হাত পা ছড়াতে ছড়াতে বড় হতে থাকে।
বড় হতে হতে ঠোঁটের নাগাল পায়।
আগুনের লকলকে জিভ কী-করে-কী-করে যেন ঠোঁটের নাগাল পেয়েছিল কাল।
আগুন আমাকে চুমু খেয়েছিল কাল।
আগুন আমার চিবুকের বুকের পিঠের পেটের যৌনাঙ্গের উরুর
নাগাল পেয়েছিল  কাল।

পুড়ে যেতে ইচ্ছে করেছে ঠোঁট,  কিন্তু পোড়েনি,
পুড়ে যেতে ইচ্ছে করেছে শরীর, কিন্তু পোড়েনি,
ছিটে ফোঁটা আগুন শেষঅবধি  কিছুই পোড়াতে পারেনি আমার।

পুড়ে যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু পুড়ে গেলে  ছাই হয়ে যাবো,   
কে চায় জেনে বুঝে ছাই হতে! কতই বা ছাই হতে পারে একা একা
একাকী নির্জন মানুষ!  

আগুনের সঙ্গে ও ছিল নিতান্তই  আমার শরীর শরীর   খেলা।
সামান্য একটু আগুন, মধ্য রাতের আগেই কী রকম দপ করে নিভে যায়,
হেরে যায়।
নিজেকে ঢুকিয়ে নিয়ে   নিজের  খোলসে,
আগুন চলে যায়, চারদিক অন্ধকার করে  চুপচাপ  বাড়ি চলে যায়।


খ.
এখনও জানি না ও আসলে আগুন ছিল নাকি  আগুনের আঁচ।
আগুন নয়, আগুন কি কখনও কাউকে না  পুড়িয়ে ছাড়ে!
সম্ভবত আগুনেরই আঁচ, আর ওকেই আগুন ভেবে মনে মনে পুড়তে চেয়েছি আমি!


কে জানে    আমারই আঁচ ছিল কি না,  আমার আগুনের!  
এক শরীর আগুন সেই কবে থেকে   মর্গে পড়ে আছে,
আমিই হয়তো একটু একটু করে ঘুম ভাঙিয়েছি,
আমিই হয়তো আমার  আগুন ছুঁইয়ে ওকে আগুন করতে চেয়েছি,
আমিই হয়তো চেয়েছি ও আমাকে পোড়াক,
কিন্তু কী করে পোড়াবে ও, আগুনের মতো দেখতে শুনতে বটে,
সত্যিকার আগুন তো নয়!


----------
প্রায় ন'বছর আগে আগুন নিয়ে আরও একটি কবিতা লিখেছিলাম! তখনও দেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ। কলকাতার দরজা সবে খুলেছে।  কবিতাটি হারভার্ডের  কেনেডি ইস্কুলে বসে লেখা।    এক শীতে বরফে ডুবে আছি, তখন। 

তুষারের ঝড়ে

হঠাৎ কে যেন আমাকে ছুঁড়ে দিল আমাকে তুষারের ঝড়ে, 
যতদূর চোখ যায়, যতদূর যায় না, চোখ ধাঁধানো সাদা, শুধু সাদা, শুধু সাঁ সাঁ
উদ্বাহু নৃত্য চলছে তুষার-কন্যার, শুকনো পাতার মতো আমাকে ওড়াচ্ছে। 
পাকে ফেলে খুলে নিচ্ছে গা ঢাকার সবক'টা কাপড়। 
আমার চুখ চোখ, 
আমার সব, 
আমার সর্বাঙ্গ ঢেকে গেছে তুষারে। 
আকাশ নেমে এসেছে একেবারে কাছে, ছুঁতে নিলেই 
জীবন্ত একটা ডাল খসে পড়লো, 
আকাশ এখন আর আকাশের মতো নয়, 
মুখ থুবড়ে সেও পড়েছে ঝড়ে। 
দু'একটি গাছ হয়তো ছিল কোথাও, ভেঙে ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে তুষার স্তূপে, 
প্রকৃতির কাফন আমাকে মুড়িয়ে নিয়ে ঢুকে যাচ্ছে কোথাও, কোনও গর্তে। 
ঠোঁটদুটো কাঁপছে আমার, কান লাল হয়ে আছে, নাকে গালে রক্ত জমে আছে, 
হাতের আঙুলগুলো সাদা, হিম হয়ে থাকা সাদা, 
আঙুলগুলোকে আঙুল বলে বোধ হচ্ছে না, কয়েক লক্ষ সুঁই যেন বিঁধে আছে আঙুলে, 
আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না, কিছুকে দেখতে পাচ্ছি না, 
সব সাদা, মৃত্যুর মতো, নৈঃশব্দের মতো, চন্দ্রমল্লিকার মতো, 
একটু  একটু করে রক্তহীন হচ্ছে ত্বক, 
একটু একটু করে তীব্র তীক্ষ্ণ শীতার্ত দাঁত আমাকে খেতে খেতে খেতে খেতে 
আমার পা থেকে হাত থেকে উরুর দিকে বাহুর দিকে হৃদপিণ্ডের দিকে উঠে আসছে, 
উঠে আসছে। 


আমি জমে যাচ্ছি
জমে যাচ্ছি আমি
গোটা আমিটি 
বরফের 
একটি 
পিণ্ড 
হয়ে 
যাচ্ছি....


ও দেশ, ও কলকাতা, একটু আগুন দিবি? 





2 comments:

  1. ''কে চায় জেনে বুঝে ছাই হতে! কতই বা ছাই হতে পারে একা একা

    একাকী নির্জন মানুষ!'' - বা রে ! তুমি কেন একাকী ছাই হতে যাবে? তুমি তো ছাই চাপা আগুন,যা মাঝে মাঝে এরম গদ্যময় শীতল জীবনে স্ফুলিংগ হয়ে ফুটে ওঠে । আমরা জানি তো, আগুন তোমায় পুড়িয়ে ছাই করতে পারে না, তোমায় ইস্পাত বানায় । যার দৃপ্ত শানিত ধার বড় সত্য কথা বলে ওঠে : কেউ কি দেখাতে পার 'এমন একটি খোলা তরবারি যা আমার চেয়ে ধারালো ?'
    আমরা যতই মুখে সাহসী বুলি বলি না কেন,ভাষা গুলো তো তোমার থেকেই শেখা। আগুন তো আসলে তুমি নিজেই...আমরা একটু হাত তাপাই মাত্র ।


    ReplyDelete