Saturday, 13 April 2013

অ্যালবাম ১





কী যেন হয়েছিল আমার একটা সময়।  কেউ একজন বলেছিল, অথবা কোথাও পড়েছিলাম, ‘ক্যামেরা ট্যামেরা ফালতু জিনিস। সবচেয়ে বড় ক্যামেরা হল মনের ক্যামেরা। সেটি দিয়ে যা দেখা যায়, তা-ই চিরকাল রয়ে যায়। মাথাটা হল অ্যালবাম। কিছুই হারাবে না, নষ্ট হবে না। আর কাগজের ছবি, ও তো ছিঁড়ে যায়। হারিয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায়’। আমি সাধারণত সহজে প্রভাবিত  হই না অন্যের কথায়। নিজে ভেবে, যুক্তি দিয়ে যতক্ষণ না তা প্রমাণ করছি, অথবা আমার মন মানছে আমার এখনও ভাবলে অবাক লাগে   আমি অত সহজে মেনে নিয়েছিলাম যে ক্যামেরা বড় খারাপ জিনিস, ওই একটা ছোট্ট মেশিনের চেয়ে আমি আমার মস্তিস্ককে বেশি বিশ্বাস করি। আই সত্যি সত্যি ছবি তোলা বন্ধ করে দিয়েছিলামবিশেষ করে সেই সময় যখন আমি মাসে কুড়ি দিনই বিভিন্ন দেশে ঘুরছি, বিভিন্ন মঞ্চে ভাষণ দিচ্ছি, বা কবিতা পড়ছি, বা  বিখ্যাত সব ঐতিহাসিক এলাকা দেখছি,   লেখক সাহিত্যক,  রাজনীতিক, নারীবাদী, মানববাদীর   সঙ্গে  আলোচনা করছি। ওই বৈচিত্রময় ব্যস্ত জীবনের বেশির ভাগ  স্মৃতিই এখন আর নেই।

বেশ অনেক গুলো বছর পার হওয়ার পর আমি বুঝতে পেরেছি,   মাথাকে বিশ্বাস করা আমার উচিত হয়নি। এ হয়তো এখনকার অংক এখন কষে দিতে পারে, কিন্তু আর্কাইভ  হিসেবে এক  ফোঁটা একে বিশ্বাস করা যায় না। স্মৃতি এই কিছুদিন আছে, তারপরই হারিয়ে যায় ফুড়ুৎ করে সেই ছোটবেলার চড়ুই পাখির মতো। শৈশব কৈশোরে অনেক কিছু চমৎকার মনে থাকে। কিন্তু বয়স যত বাড়ে, তত যে স্মৃতি ঝাপসা হতে থাকে, তা ডাক্তার হয়ে জানা  উচিত ছিল আমার। আসলে ওই জ্ঞানটাও মাথা থেকে উবে গিয়েছিল। তা না হলে ক্যামেরাকে কেন আমি গুডবাই বলবো!

একসময় লক্ষ করলাম আমি আর কিছুই মনে করতে পারছি না, কার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো, কী কথা হয়েছিল, উল্লেখযোগ্য কী কী ঘটেছিল, কী কী দেখেছিলাম, কোথায় কোথায় গিয়েছিলাম। স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে গেল। আর যে ছবিগুলো কোনও না কোনও কারণে আমার কাছে আছে, সেসব স্মৃতি দুপুরের আলোর মতো জ্বলজ্বলে। একটা ছবি কত কিছুই না  মনে করিয়ে দেয়। ছবি হল জীবন্ত ডায়রি। কিছু ছবি ছিল বলে  আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে অনেক ঘটনার কথা মনে পড়েছে। ওই ছবিগুলো না থাকলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাই যেমন হারিয়ে গিয়েছিল স্মৃতির কুঠুরি থেকে, তেমন হারিয়ে যেত আমার জীবনের ইতিহাস থেকে।   আত্মজীবনী লেখার সময় ছবির মূল্য আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। 





আমাদের বাড়িতে প্রথম ক্যামেরা এনেছিল আমার বড়দা, যাকে দাদা বলে ডাকি।  সেই ছোটবেলায় দাদাকে দেখতাম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে অনেক ছবি তুলতো। তারপর আরও একটু বড় হয়ে   চিত্ররূপা স্টুডিওতে   ক’দিন পর পরই ছবি তুলতে যেত।  সেই সব পোজ দেওয়া ছবিগুলো  আবার  বড় বড় ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতো।  পাঞ্জাবি পাজামা, কাঁধে শাল, হাতে শেষের কবিতা। দাদার চেহারাটা  বেশ নায়ক নায়ক ছিল।   মাঝে মাঝে আমাদের নিয়ে যেত ছবি তুলতে। একবার বাবা আমাকে তার গাঁয়ের বাড়িতে নিয়ে গেল  দাদি মারা যাওয়ার পর। ওই আমার প্রথম যাওয়া বাবার গাঁয়ের বাড়ি। ও-ই শেষ।   কত যে ছবি তুলেছিলাম বাবার। সব আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে, বাবার বাবা বেঁচে ছিল তখন, তার সঙ্গে। দাদির কবরের সামনে। বাবার শৈশবের সেই ঘর দুয়ার, সেই মাঠ, সেই খেত খামারের সঙ্গে।      যেসবের গল্প শুনেছিলাম অনেক,   দেখিনি আগে, সেসবের ছবি। ছবিগুলো বেশ ছিল।  তবে আমাদের ময়নসিংহের পুরোনো বাড়িটা  একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা স্যাঁতসেঁতে ছিল বলে, নাকি ব্রহ্মপুত্রের লোনা হাওয়ার কারণে, জানি না,   ছবি খুব নষ্ট হতে যেত। নষ্ট হওয়া শুরু হলে   রোদে দেওয়া হত  ছবি। জানি না রোদ    ছবির আদৌ কোনও উপকার করতো কি না। একবার বাইরের সিঁড়িতে বাবার  এক-অ্যালবাম-ছবি রোদে দিয়েছিলাম। পরে আর  অ্যালবামটা পাইনি।  এখনও মনে পড়ে  রোদের সিঁড়ি থেকে হারিয়ে   যাওয়া ছবিগুলোর কথা। কষ্ট হয়।  
 

ভাবছি  অ্যালবাম নামে মাঝে মাঝে একটা সিরিজ ব্লগ লিখবো, যেখানে পুরোনো ছবি নিয়ে, তার পেছনের কাহিনী নিয়ে কথা বলবো। আমার, আমার বন্ধুদের, আত্মীয়দের, চেনা পরিচিতদের, অচেনাদের ছবি।   বিরাট , বিশাল কোনও কাহিনী নয়, একেবারে সাদামাটা কিছুও হতে পারে।  হাঁটছিলাম, জায়গাটা ভালো লাগলো, ছবি তুললাম। এরকম। আগে থেকে কোনও প্ল্যান করে নয়। যে ছবি হাতের কাছে পাই, সে ছবি নিয়েই।

শুধু কি ক্যামেরা না ব্যবহার করার জন্য ছবির স্বল্পতা আমার কাছে? এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক শহর থেকে আরেক শহর করতে হচ্ছে আমাকে আজ দীর্ঘ পঁচিশ বছর। দেশে দেশে   দৌড়োতে হচ্ছে আমায়, বেশির ভাগ দৌড়েনোই অন্যের ইচ্ছেয়, বা নিরূপায় হয়ে। এই করে করে হারিয়ে গেছে শত শত ছবি, শত শত স্মৃতি। যেটুকু অবশিষ্ট পড়ে আছে, তা-ই না হয় স্মরণ করবো। নতুন হোক, পুরোনো হোক। নতুন বলতে সত্যি কি কিছু আছে? এই তো একটু আগে যা নতুন ছিল,  এখনই তা  পুরোনো হয়ে গেছে। আমরা খুব দ্রুত এগোচ্ছি আমাদের  শেষ দেয়ালের দিকে। 




তখনও দেশের অবস্থা অত ভয়ংকর হয়নি। তখনও আমার পক্ষে মিছিল হতে পারতো ঢাকার রাস্তায়। কিছু ছেলেমেয়ে আমার পক্ষে পথে নেমেছিল। গার্মেন্টসএর মেয়েরাই ছিল বেশি। ব্যানার ধরে আছেন বিখ্যাত ভাস্কর শামীম শিকদার। সম্ভবত ১৯৯৩র শেষ দিকে বা  ১৯৯৪র প্রথম দিকে।   


আমি অজ্ঞাতবাসে, লক্ষ লক্ষ মৌলবাদী আমার ফাঁসির দাবিতে  মিছিল মিটিং করছে। ঘোষণা করেছে, আমাকে   ঢাকা শহরের প্রতিটি বাড়িতে খোঁজা হবে, এবং পেলে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলা হবে, শুধু আমাকে নয়, আমাকে যারা আশ্রয় দিচ্ছে, তাদেরও। ইসলামকে বাঁচাতে হলে এ ছাড়া আর   পথ নেই। জুলাই, ১৯৯৪ 



অজ্ঞাতবাসে একদিনই দেখা হয়েছিল আত্মীয়দের সঙ্গে। গোপন ঠিকানায় গোপনে মধ্যরাতে এসেছিল বাবা আর ছোটদা। ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল সেদিনই গোপনে। কদিন পর পরই বদলে যেত অজ্ঞাতবাসের ঠিকানা। কেউ জানতো না আমি কবে কোথায় কার বাড়ির কোন বন্ধ ঘরে লুকিয়ে আছি। অজ্ঞাতবাসের এই ঘরটিতে বসে তেলরঙে কিছু ছবি এঁকেছিলাম। একটি ছবিতে আমি নিজে, আমাকে ঘিরে আছে টুপি পরা কতগুলো সাপ। বাবা আম খাওয়াতে চেষ্টা করছেন। তখন কি আর কিছু খেতে ইচ্ছে করে! মৃত্যু বসে থাকে পাশে সারাদিন, শিয়রের কাছে সারারাত। জুন বা জুলাই ১৯৯৪






দু’মাস অজ্ঞাতবাসের পর ঘরে ফিরেছি। দু’মাস মা কেঁদে  কেঁদে বুক ভাসিয়েছে।  মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মা। পাশে আত্মীয় স্বজন, মিলন (ছোটবোনের স্বামী), সুহৃদ (ছোটদার ছেলে), ছোটদা।  ৩ আগস্ট, ১৯৯৪




শান্তিনগরের ফ্ল্যাটে আমার স্টাডিতে। বড়দা, ছোটদা, গীতা বৌদি, সুহৃদ সঙ্গে। আমি তখন ভুলেও ভাবিনি আমার শখের ঘরদোর ছেড়ে   চিরকালের মতো আমাকে নির্বাসন জীবন যাপন করতে  হবে। ৩ আগস্ট, ১৯৯৪    


    ১৯৯৪ সাল, আগস্ট রাত। দীর্ঘ দু'মাসের অজ্ঞাতবাস শেষে ঘরে  ফিরেছি, হাই কোর্ট থেকে জামিন নিয়েধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছি এই অভিযোগ করে সরকার আমার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছিল।  গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। অজ্ঞাতবাসে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না আমার। ধর্মীয় অনুভূতি খুব বাজে অনুভূতি। কয়েদি, পুলিশ, রক্ষী হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে। ল'ইয়ারের পরামর্শেই অজ্ঞাতবাসে যাওয়া। দু'মাস পর  জামিন নাকি দিয়েছিল এই গোপন শর্তে যে আমাকে দেশ ছাড়তে হবে।  সে রাতে   আমার শান্তিনগরের ফ্ল্যাটে  আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন  দেশের প্রখ্যাত ক’জন কবি,  বুদ্ধিজীবী। অজ্ঞাতবাসে ওঁরা  আমাকে বাঁচিয়েও রেখেছিলেন। খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, রুবী রহমান আর তাঁর  স্বামী নূরুল ইসলাম। নিচে কার্পেটে আমি, আমার পাশে আমার ছোটদা। কী নিয়ে কথা হচ্ছিল? নিশ্চয়ই তখনকার রাজনৈতিক অবস্থা। মৌলবাদীদের আসকারা দিয়ে দেশের কত বড় সর্বনাশ খালেদা জিয়া    করছে। সারাদেশ জুড়ে মুসলিম মৌলবাদীরা আমার ফাঁসির দাবিতে তাণ্ডব  করেছে, মানুষ মারছে,  বেআইনি ভাবে আমার মাথার দাম ঘোষণা করছে, খালেদা জিয়ার সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, বরং কালসাপগুলোকে দুধ কলা দিয়ে পুষছে।   দু'দিন পর আমাকে চলে যেতে হয়েছিল দেশ ছেড়ে। আমার দেশটায়  আামাকে আর ফিরতে দেয়নি কোনও সরকারই। কালসাপগুলো এখন আরও বড়। আরও বিষাক্ত।

5 comments:

  1. ei chhobi gulo ageo dekhecchi. kintu etota ghotona jantam na. bhalo laglo porHe.

    ReplyDelete
  2. আপনার সৃতিচারন অসাধারণ, পড়লে চোখেপানি আসে। আমার খুব কষ্ট হয়, মনেহয়, আপনাকে আবার ফিরেপেতে কবিতার আসরে, বাংলার আনাচে কানাচে। হায়, জানিনা আর কখন পাবকিনা আপনাকে এই সুরের গীতাঞ্জলীতে, পথ চলিতে চলিতে বাংলার অলিতে গলিতে।

    ReplyDelete
  3. We are still fighting for the same fanaticism and know this won’t be a short way pass thru. One research says, in one locality at hathazari, chittagong there are 29 madrasas. No one knows how these are continually growing and for what purpose. Don’t we need an umbrella approach to a reality sketch how our education would serve the country matching with its goal and purposes we accepted after the birth of the nation?

    ReplyDelete
  4. tui nishiddho, tui kotha kois na... mone pore gelo.

    ReplyDelete
  5. tomar lekhar chabuk amake sompurno ami hote sahajyo koreche. atmo biswas diyeche,bhabte sikhiache amar meye bela bole ekta kotha, ja ekantoi amar nijosyo.tumi amar prerona. onek bhalo basa.

    ReplyDelete