Wednesday, 6 February 2013

বর্বরতাকে একবার প্রশ্রয় দিয়েছো কী মরেছো









রুশদিকে কলকাতায় আসতে দেওয়া হয়নি, এ নিয়ে মড়া-কান্না শুরু হয়ে গেছে চারদিকে। যারা এখন কেঁদে কেটে বুক ভাসাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই   মুখ বুজে ছিল অথবা বই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কথা বলেছিল, যখন ২০০৩ সালে আমার  ‘দ্বিখণ্ডিত’ বইটি ‘মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে’  কারণ দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। মুসলমানরা রাস্তায় নামেনি, বই নিষিদ্ধ করার দাবি করেনি। কিন্তু তখনকার মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আগ বাড়িয়ে বইটি নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর মাথা থেকেই বই নিষিদ্ধের কুবুদ্ধিটা বেরিয়েছিল!  তিনি অবশ্য বলেছিলেন, ২৫ জন বুদ্ধিজীবী নাকি আমার  দ্বিখণ্ডিত   নিষিদ্ধ করার জন্য তাড়া দিচ্ছিলেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বোঝা উচিত ছিল, যারা লেখকের বই নিষিদ্ধ করার আবদার করেন, তারা আর যাই হোন না কেন, বুদ্ধিজীবী নন।  বই নিষিদ্ধ করার পেছনে যে কারণগুলো দাঁড় করানো হয়েছিল, সেসব যে    নেহাতই ভিত্তিহীন আর হাস্যকর, তা বই নিষিদ্ধ হওয়ার দু’বছর পর কলকাতা হাইকোর্টই  বলে দিয়েছে, বইটিকে  মুক্তিও দিয়েছে।  বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কী দায় পড়েছিল মুসলমানদের মনের আঘাত বাঁচাতে গণতন্ত্রের সব চেয়ে বড় শর্ত বাক স্বাধীনতার ওপর খড়গহস্ত হওয়ার?

  কলকাতায় আমি তখন পাকাপাকিভাবে বাস করছি।  একসময় আমার সঙ্গে সখ্য থাকলেও বই নিষিদ্ধ করার পর রীতিমত ব্রাহ্মণের মতো আচরণ শুরু করলেন, আমার মতো নমশুদ্রর ছায়াও আর মাড়ালেন না। বই মুক্তির পর তো আরও নয়। ভেবেছিলাম বুদ্ধবাবু হয়তো একদিন নিজের ভুল বুঝতে পারবেন।  কিন্তু ভুল ভাবনা। হায়দারাবাদি মুসলিম মৌলবাদিরা আমার আক্রমণ করার পরদিন থেকেই তিনি নতুন নকশা আঁকতে শুরু করেছিলেন। আমি জানিনা সেই নকশা আঁকায় মোট ক’জন বুদ্ধিজীবী তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমি নিরীহ, নির্যাতিত, নির্বাসিত   মানুষ। রাজনীতির প্যাঁচ কোনওদিনই ঠিক বুঝতে পারি না। ২০০৭ এর আগস্টে আক্রান্ত হলাম, সেই আগস্টেই কলকাতার মৌলবাদী নেতারা হায়দারাবাদের মৌলবাদী নেতাদের ডেকে এনে কলকাতার ধর্মতলায় রাস্তা বন্ধ করে বিশাল এক জনসভা করলেন, আমার মাথার দাম   ঘোষণা করার জনসভা।    কেউ আমার মাথাটা কেটে নিয়ে গেলে তাকে ‘আনলিমিটেড অ্যামাউণ্ট’ টাকা দেওয়া হবে। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশের বড় কর্মকতারা।  সেদিনের সেই  মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের কাউকে     বেআইনি ফতোয়া জারি করার জন্য গ্রেপ্তার করা তো হয়ইনি,  বরং বেশ সম্মানই করা হয়েছিল। তখন থেকেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পুলিশের বড় বড় কর্তাদের পাঠাতে শুরু করলেন আমার বাড়িতে, কী, কলকাতা থেকে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে, পারলে দেশ থেকে আমাকে বেরিয়ে যেতে হবে। কেন বেরোতে হবে? আমি কলকাতায় বাস করলে কলকাতার মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে, তাই।
এদিকে নন্দিগ্রাম, সিঙ্গুর আর রিজওয়ান নিয়ে রাজ্যে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। মুসলমানরা সিপিআইএমএর ওপর ক্ষেপে আগুন হয়ে আছে। নভেম্বরের একুশ তারিখে পার্ক সার্কাসের   গলি থেকে কিছু লোক বেরিয়ে গাড়ি পোড়াতে শুরু করলো, পুলিশকে ঢিল ছুড়তে শুরু করলো।  কেন রাগ?   নন্দিগ্রাম, সিঙ্গুরে মুসলমান মেরেছো কেন, রিজওয়ানকে মেরেছো কেন, তাই রাগ।  হঠাৎ সারাদিন পর কে একটা হাতে লেখা একটা কাগজ উঁচু করে ধরলো, ওতে লেখা ‘তসলিমা গো ব্যাক’। ব্যস, আমাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হল জয়পুর। টিকিট মূখ্যমন্ত্রী আগেই কেটে রেখেছিলেন। ওয়ান ওয়ে টিকিট। তারপর শত চেষ্টা করেও আর পশ্চিমবঙ্গে পা দিতে পারেনি। আমার বাড়ি ঘর, বেড়াল, বন্ধু,  সব কলকাতায়। বাংলাদেশ থেকেও আমাকে তাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে থেকে তাড়ানোটা বাংলাদেশের চেয়েও নিষ্ঠুর আর মর্মান্তিক। আজও  পশ্চিমবঙ্গের ত্রিসীমানায় যাওয়া আমার জন্য নিষিদ্ধ। মমতা বন্দোপাধ্যায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কোনও কিছু না মানলেও এটা মানেন যে তসলিমার জায়গা পশ্চিমবঙ্গে নেই। আমার ক্ষেত্রে  তিনি বুদ্ধদেবের পদাঙ্ক খুব নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে চলেছেন ।

রুশদিকে একবেলার জন্য কলকাতায় আসতে না দেওয়ার পেছনে ওই একই কারণ।  রাজ্য  নষ্ট হয়ে গেছে। রাজ্য নষ্ট করার জন্য দায়ী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি যদি সেদিন আমার বই নিষিদ্ধ না করতেন, আমাকে জন্মের মতো  না তাড়াতেন আমার কলকাতার বাড়িঘর থেকে।, তাহলে আজ নিশ্চিতই রুশদি কলকাতায় যেতে পারতেন। তাঁর ওই একদিনের অনুষ্ঠানে কলকাতা ভ্রমণে কোনও বাধা আসতো না।

 বুদ্ধবাবুই মৌলবাদীকে শক্তি এবং সাহস জুগিয়েছেন। আজ তারা তাই এয়ারপোর্ট অবধি চলে যেতে পারে এবং একইভাবে ওই রকম কাগজ নিয়ে, ‘রুশদি গো ব্যাক’। কারণ তারা জেনে গেছে, তারা যা চায়, তাই তাদের পাইয়ে দেওয়া হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রে চাওয়ার আগেই প্রাপ্তি চলে আসে। আজ যে বুদ্ধবাবু বলছেন তিনি রুশদিকে আসতে দিতেন ক্ষমতায় থাকলে। মিথ্যে কথা। অথবা   দিতে চাইলেও  তার মৌলবাদী   ফ্র্যাংকেনস্টাইন    রুশদিকে সর্বশক্তি দিয়ে বাধা দিত, রায়ট বাধাতো।  ওই ফ্র্যাংকেনস্টাইনই  যেমন বুদ্ধবাবু-সহ তাঁর পুরো দলকে  ভোটে হারিয়েছে, তসলিমাকে তাড়িয়ে একটি বাড়তি ভোটও যেমন জোটেনি, ঠিক তেমনই  হত।

আজ শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখছি অসহিঞ্ষুতা। কাশ্মীরের মুফতি ফতোয়া দিলেন মেয়েরা গান গাইতে পারবে না। তামিল নাডুতে কমল হাসানের ছবি দেখানো চলবে না। আর্ট গ্যালারিতে ন্যুড ছবি রাখা যাবে না। অসহিঞ্ষুতাকে প্রশ্রয় দিতে দিতে এমন হয়েছে যে  অসহিঞ্ষুতা এখন মাথায় উঠে  বসেছে। একবার যদি মাথায় উঠতে দিয়েছো, একবার যদি আপোস করেছো বর্বরতার সঙ্গে,  তাহলে বাকি জীবন আপোস করে যেতেই হবে। বর্বরতা এমনই জিনিস, একবার একে মাথায় উঠতে দিলে আর নামাতে পারবে না।  দোষ  বর্বরতার নয়,  দোষ তোমার, বর্বরতাকে তুমি জেনে শুনেই ডেকে এনেছো। জেনে শুনে তুমিই বিষ পান করেছো। এখন মৃত্যুর সময় অন্তত নিজের ভুলগুলো স্বীকার করো।       



5 comments:

  1. যেসব জিনিস ঠিক ঠাক নিষিদ্ধ করা উচিত, পর্ণ,দেহব্যবসা, সেসব বাদ দিয়ে একটি বই নিষিদ্ধ করার পেছনে ঠিক কি কারণ থাকতে পারে রাজনীতি ছাড়া? যারা আপনার বিরুদ্ধে মিছিল করে ফতোয়া দেয়, আমার মনে হয় না তারা বই গুলো পড়ে কিছু বুঝতে পারবে, বা তার নির্যাস টি গ্রহণ করতে পারবে। অথবা তথাকথিত 'আপত্তিকর' জায়গা গুলো খুঁজে বের করতে পারবে।
    এগুলো বিশেষ যত্ন নিয়ে তাদের মাথায় ঢোকান হয় অন্য স্বার্থসিদ্ধির জন্য।
    আপনি একজন victim এই অসভ্যতার। আজকে govt. বলছে যে রুশদি আসলে মুসলমান মৌলবাদীরা ঝামেলা করতে পারে। এই মুসলমান মৌলবাদীদের তৈরি কে করেছে?

    ReplyDelete
  2. thank u taslima. sotto ta amra jantam. r o bhalo kore tule dhorle.ei bodmaisir vit to budhodeb er sorkar er somoyei toiri hoyechilo.somajer sarbik unyon korte na pere moulobadider tolla diye vablo sorkar voter boitoroni par hobe! manush eto boka na, chokhe thuli pore je nei, vot e har ta proman kore dei. r mamata to r o kharap! parle moulobaduder pa dhue dei. opodhartho sob amader banglar mathai bose ache.jara ¨go back¨ bole tara na porei uddesho pronodito bhabe lekhe ba bole. ei moulobadi ra chai na somajer narira egiye asuk, ondhokar sore alo asuk.
    ei vondo neta ra na sorle somaj pichotei thakbe!

    ReplyDelete
  3. রাজনীতিকরা যদি ভুল স্বীকার করার সাহস দেখাত (কিছু নিজেদের তৈরি 'ঐতিহাসিক' রাজনীতির ভুল-স্বীকার ছাড়া) তাহলে তো তোমাকে ফেরানোর রাস্তা দেখাত, রুশদিকে স্বাগত জানাত । ওরা ভোটের অংক কষে সুবিধামত একসকালে তসলিমা তাড়ায়, আবার একবিকেলে সুবিধা মত রুশদির জন্য কুম্ভিরাশ্রু ঝড়ায়, আর সেই সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী মাথা-ঢেকে প্রধান ইমামদের জমায়েতে 'ডেটিং' সারেন ।সত্যি কথা হল, বাঙালির বর্তমানের সবক'টি রত্নকে 'নির্বাসন' দেওয়ার পর, কোনো বড় বুদ্ধিজীবিও বলতে ভয় পাবে কবে এ বঙ্গের সব হারানো কাঙ্গালপণা ঘুচবে !

    ReplyDelete
  4. Taslima's comments about Buddhababu is biased.Otherwise her other comments are right.

    ReplyDelete
  5. দিদি,
    বহুদিন কিছু লেখেন না। অন্তত মাঝে মধ্যে দুটো কবিতাও তো উপহার দিতে পারেন। মাঝে মাঝেই খুলি ব্লগটা আর নিরাশ হই।
    -অভিমানী ভাই

    ReplyDelete