Thursday, 17 January 2013

সেই দিনগুলো








শীতের সকালে উঠোনে দাঁড়িয়ে রোদ তাপাতাম।   বড় থালায় করে গরম ভাপা পিঠে নিয়ে কুয়াশার ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে  বস্তির কিশোরীরা   আসতো। পিঠেগুলো পাতলা   কাপড়ে ঢাকা থাকতো। কী যে অসম্ভব স্বাদ  ছিল ওই সব  পিঠের! ভাপা পিঠে বড় হয়ে  খেয়েছি। কিন্তু অমন স্বাদ আর পাইনি। 
নানিবাড়ির  বরই ছিল  শহরের সবচেয়ে  সুস্বাদু  বরই।  বড় হয়ে বরই অনেক খেয়েছি। নানিবাড়ির বরইয়ের চেয়ে বেশি সুস্বাদু বরই আমি আর খাইনি। শুধু কি নানিবাড়ির বরই, আমাদের বাড়ির সেই পেয়ারা, সেই কাঁঠাল‍! কখনও কি অত ভালো পেয়ারা বা কাঁঠাল আর কোথাও খেয়েছি? খাইনি। একটুও বানিয়ে বলছি না।  


মা রান্না করতো মাটির চুলোয়। ফুঁকনি ফুঁকে ফুঁকে কী যে অসম্ভব কষ্ট করে  আগুন জ্বালাতে হতো মা’কে। সবসময় কাঠ থাকতো না, গাছগাছালির ডাল পাতা দিয়েই রান্না করতো মা। কিন্তু মা যা কিছুই রান্না করতো, সবকিছুর  স্বাদ ছিল অবিশ্বাস্যরকম ভালো। বড় হয়ে সারা পৃথিবীর কত বড় বড় দেশের কত বড় বড় রেস্তোরাঁয় খেয়েছি। কত বড় বড় ব্যাংকোয়টে। মা’র হাতের ওই রান্নার চেয়ে সুস্বাদু আর কোনও রান্না আমি আজ অবধি খাইনি। এর কারণ কি এই যে ছোটবেলার স্বাদ গন্ধ  স্মৃতির কোষে কোষে এমনভাবে ঢুকে যায় যে কিছুই আর  একে সরাতে পারে না! নাকি অন্য কিছু!  মা ছিল জাদুকরের মতো। মাঝারি কোনও হাঁস বা মুরগি রান্না করে বাড়ির বারোজন লোককে দুবেলা খাওয়াতো। তারপরও   কিছু টুকরো  রেখে দিত পরদিন সকালে রুটি-মাংসের   নাস্তার   জন্য। মা’র সবকিছুতে বড় জাদু ছিল।   নিজের হাতে  লাগানো নারকেল গাছের নারকেল দিয়ে মা     তকতি বানাতো। যখনই তকতি খাই, মা’র ওই তকতির তুলনায়, বুঝি, যে, এ কিছুই নয়। মা প্রায় সারা বছরই নিজের বাগান থেকে তুলে শাক সবজি ফল মূল খাওয়াতো। ওগুলোর তুলনা ওগুলোই 
      
শুনেছি নিজের মা’র রান্নার প্রশংসা সবাই করে। রান্নাঘরই মেয়েদের জায়গা, পুরুষতান্ত্রিক এই ধারণার বিরুদ্ধে আমি ভীষণ প্রতিবাদ করি। কিন্তু রান্নাকে আমি নিখুঁত এক শিল্প বলে মেনেই মা'কে অসাধারণ শিল্পীর মর্যাদা দিচ্ছি, মা বলে মা'র প্রশংসা করছি না।   শুধু মা'র নয়, নানির রান্নাও  ছিল   অতুলনীয়।    নানির রান্নাঘরে পিঁড়িতে বসে ভাত খেতাম, মাছ বা মাংস দিয়ে খাওয়া  শেষ হলে দুধভাত। দুধ খেলে, নানি বলতো,  ব্রেন ভালো হয়। ছোট একটি শিং মাছের টুকরো, বা ছোট একটি মুরগির পাখনা, বা খাসির নলি,  আর তার ঝোল দিয়ে এক থালা ভাত খেয়ে  কী যে ভীষণ তৃপ্তি   হতো!  এখন এক বেলাতেই প্রায় এক কিলো মাছ বা মাংস খাওয়া হয়ে যায়। এতেও   সেই আগের তৃপ্তি জোটে না! 

ছোটবেলার একটি  দৃশ্য   আমার খুব বেশি ভালো লাগতো।   নানির   ঘরে বিকেলে বই পড়া হতো, একজন পড়তো, বাকিরা চুপ করে সেই পড়া শুনতো। মামা, খালা, মা, নানি, পড়শিসবাই শুনতো। কোনও ধর্মের বই নয়। গল্পের বই। ওই বই পড়া শুনতে শুনতেই, আমার বিশ্বাস, আমার বই পড়ার অভ্যেস হয়েছে। বই পড়ার অভ্যেস থেকেই গড়ে উঠেছে বই লেখার অভ্যেস। নানির ঘরের ওই চমৎকার দৃশ্যটা আর কখনও আমি দেখতে পাবো না, যখন ভাবি, বুকের ভেতর   নিঃশব্দে একটা কষ্টের স্রোত বইতে থাকে। বইতে থাকেই। মা নেই। সেই মামারা নেই, যে খালা বই পড়তো, সেও নেই। কেমন একটা নেই নেই চারদিকে। শুধু দৃশ্যটা গেঁথে আছে হৃদয়ে।  

ছোটবেলার আনন্দগুলো বড় তীব্র ছিল।   পরার তিনটে জামা হলে যে সুখ পেতাম, এখন আলমারির তিনশ জামাও সেই সুখ দেয় না। ছোটবেলার অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। সকালে মুড়িওয়ালা যেতো। ‘মুড়ি...............’র শব্দ শুনে দৌড়ে  বেরিয়ে   মুড়িওয়ালাকে বাড়িতে ডেকে আনতাম। বাবা  পুরো  মুড়ির টিনই  কিনতো।  সেই টিনের মুড়ি সারা মাস খাওয়া হতো। কত কিছু নিয়ে যে ফেরিওয়ালা যেতো! চুরি ফিতে যেতো দুপুরবেলায়। ওসবে একটুও আকর্ষণ ছিল না আমার। বাদামওয়ালা, বুটওয়ালা, চানাচুরওয়ালা আইসক্রিমওয়ালা যেতো।  বিকেলে বারান্দায় বসে ঝালনুন মিশিয়ে চিনেবাদাম   খেতে খেতে গল্প করার সেই আনন্দ এখন আর নেই। সেই দুপুরবেলার তেঁতুল, সেই রোদে দেওয়া মা’র বয়ামের আচার! ওই জীবন আর শত চাইলেও ফেরত পাবো না। যা গেছে তা যেন চিরকালের জন্যই গেছে। বাড়ির মাঠে সেই বৌচি খেলা, সেই চোর চোর, সেই হাডুডু, সেই মার্বেল, সেই লাটিম, ডাংগুলি—আর কি ফিরে আসবে কখনও! আজকালকার বাচ্চারা কমপিউটার গেইম খেলে, ভিডিও গেইম খেলে, এসবই তাদের ভালো লাগে।  আমরা একালে জন্মালে আমাদেরও কমপিউটার গেইমই ভালো লাগতো, মাঠে মাঠে দৌড়োনোকে অর্থহীন বলে মনে হত। ভাগ্যিস তখন জন্মেছিলাম! তখন জন্মেছিলাম বলে ধুলোবালিতে  গড়াগড়ি খেয়েছি, যন্ত্রহীন সমাজের স্বাদটা পেয়েছি। হ্যারিকেন  জ্বালিয়ে সন্ধেয় পড়তে বসেছি, হাতপাখায় বাতাস করে গ্রীস্মকাল কেটে গেছে, বুঝিনি কখনও যে  বৈদ্যুতিক বাতি বা  পাখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। টেলিভিশন ছিল না, রেফ্রিজারেটর ছিল না, মোবাইল ফোন ছিল না, কমপিউটার ছিল না, কিন্তু কখনও মনে হয়নি কিছুর আর প্রয়োজন আছে, যা আছে তার বাইরে।  এখন এই যন্ত্রনির্ভর, অর্থনির্ভর সমাজের  অভিজ্ঞতাও হচ্ছে। ইতিহাস পড়ে জানা, আর নিজে যাপন করে জানায় কিছু তো পার্থক্য থাকে। একালের জীবন সেকালের জীবন থেকে ভিন্ন। দু'টো দু'রকম সময়ের  সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। এ আমাদের  সৌভাগ্যই বটে। এক জীবনে কত কিছু দেখা হল। এখানে দাঁড়িয়ে অন্তত কিছুটা হলেও তো ধারণা করতে পারি ভবিষ্যৎটা ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে।

দিন দিন মানুষের ধন দৌলত বাড়ছে, জৌলুস বাড়ছে, ভোগ বিলাস বাড়ছে, সাজগোজ বাড়ছে। আগে আমাদের অল্পতে সুখ হতো, এখন অল্পতে সুখ হয় না। আগে দরিদ্র ছিলাম আরো এবং এখনকার চেয়ে সুখী ছিলাম আরও। 



সুখের সঙ্গে সত্যি বলতে কি ধন দৌলতের খুব একটা সম্পর্ক নেই।
 

6 comments:

  1. মন ছুঁয়ে গেল এ লেখায়,আপনার আগের বেশ কিছু ব্লগ পড়ে চোখে জল আসেনি , চোয়াল শক্ত হয়েছে বার বার, কিন্তু এটা পড়ে চোখে জল এল,কারন শুধু বড়ই বাদে আর প্রায় সব আমার চেনা, না সবই চেনা তা বলবো না,বলাটা অন্যায় হবে কারন যে কষ্টের মধ্যে দিয়ে আপনাকে যেতে হয়েছে তা আমরা আনেকেই বুঝবো না,কিছুটা অনুভব নিশ্চই করবো, তবে "হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলা" র মন খারাপ করা অনুভূতিটা একই থেকে যায়,আপনার মত এত সুন্দর করে তো আমরা লিখতে পরি না তাই পড়ে খুব ভালো লাগে আর মন খারাপ হলেও মন খারাপের মধ্যেও একটা সুখের আনুভূতি নিশ্চই হ্য়।সুন্দর শৈশবের আনুভূতি।যা সবাই পায় না।একটা কথা শুধু মনে হ্য় "আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম"।.লেখাটা আমার মা কেও পড়ে শুনিয়েছি।মায়েরও ভালো লেগেছে খুব। অনেক ধন্যবাদ দিদি।

    ReplyDelete
  2. thik e bolecho sukh er sathe doulot er khub ekta somporko nei.doulot er kemon ekta aste gondho ache. sukh holo olikh, tir-tire ek odvut onuvuti!tomar lekha pore mon vore jai, chokhe jol ase.amio to choto belatake banchia rakhar jonyo koto jaigai dourai.bhalo theko.onek sundor lekha chai,tomar kobita chai.

    ReplyDelete
  3. আপনার লেখা পড়ে মনে হয়না যে পড়ছি। মনে হয় গল্প শুনছি। সেইসব গল্প যেগুলো আমার দিদার কাছে এখনো শুনি, যেগুলো শুনে আমার মনে হয় আর কিছু দিন আগে জন্মালেই হত। অবশ্য এই সব ভালো ভালো জিনিস কিছু আমিও পেয়েছি। সে নেহাত আমার মায়ের জন্ম পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার একটি অপূর্ব সুন্দর গ্রামে বলে, সেখানে এখনো আমার হৃদয় এর একটি টুকরো পড়ে আছে বলে।
    অদ্ভুত প্রাঞ্জল আপনার ভাষা। অসাধারণ লাগলো পড়ে।

    ReplyDelete
  4. Apnar post ti pore onek onek valo legeche.Asole Choto belar sei sad, gondho,hasi, anondo sobari pray aki rokom. tai jokhon porchilam mone hoyeche amar sei harano choto belar kothai jeno apni likhechen. Thanks.

    ReplyDelete
  5. দ্বিতিয় বার মতামত লিখতে বাধ্য হচ্ছি একটা ছোট্ট অনুভূতি থেকে। যে অনুভূতিটা অনেকটা শীতকাল থেকে গ্রীষ্মকাল যাওয়ার ঠিক মাঝামাঝি সময়ের আনুভূতির মতই সুন্দর। আমি পূব বংলার মানুষ হয়েও বরই মানে জানতাম না,এটা একটু লজ্জার ঠিকই কিন্তু,গতকাল "টুইট্টার"এ তাসলীমাদি বরই-এর মানে বুঝিয়ে দিলেন শুধু তাই নয়, কিভাবে বরই শব্দটা বাংলায় এল এবং তার অপর নামের ইতিহাসটা কি,সেইটাও বুঝিয়ে দিলেন এখানেই শেষ নয়, একটা লিংক (www.flickr.com/photos/3point141/6355839039/) দিলেন যা থেকে বরই বা কুল-এর একটা ছোট্ট ইতিহাস জানলাম।তারপর মায়ের কাছে একটা বকুনিও খেলাম অভিধান দেখিনি বলে।মা জানত বরই মানে কুল।হয়ত এই ঘটনাটা কিছুই নয়, কিন্তু আমার কাছে অনেক কিছু। শিক্ষা গ্রহন করার শিক্ষা আর শিক্ষা দান করার শিক্ষা হয়তো শৈশব থেকেই গড়ে ওঠে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মানুক আর নাই মানুক তাতে কিছু আসে যায় না কিন্তু আমি বিশ্বাস করি একজন নারীর শিক্ষাদানের ক্ষমতা,প্রবনতা,আন্তরিকতা এবং ধরন পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশী এবং উন্নত মানের।এইসব শুধুমাত্র কথার কথা নয়। আমি দেখেছি এ গুন আমার মা,দিদা,মাসিমনি,পিসি, ও স্কুল কলেজের শিক্ষীকাদের মধ্যে, দেখেছি আমার কলেজের ক্যান্টিনে যে কাকিমা রান্না করেন তার মধ্যেও। আমি কলকাতার গোলপার্ক এলাকায় যে রামকৃষ্ণ মিশন আছে ওইখানে ইংরেজি শিখতে যেতাম আর সেখানে ভাষাশিক্ষা দানের জন্যে প্রায় সবাই শিক্ষীকা। সেখানেও দেখেছি।আজও দেখলাম। অর্থ নয় অভিজ্ঞতাই সম্পদ।

    ReplyDelete
  6. Apnar Harano sukh khuja pabar uapi ase.apni gorib sisu dek Jama-kapor,khabar kene dan.odek mukhe j khusi dakben tate apnar mon vore jabe.osustho manus k tk dea help koren.mon anonde vore jabe

    ReplyDelete