Thursday, 20 December 2012

কেয়ামত




      


বয়স যখন আমার  পাঁচ,  তখন প্রথম শুনলাম দজ্জালের কথা। দজ্জাল আসছে    কাল বা পরশু। এ মাসে, অথবা দু’মাস বাদে।  দজ্জাল এক এক-চোখা  বীভৎস দানব।    হাতের তলোয়ার হাওয়ায় ঘোরাবে আর   কেটে ছিড়ে মানুষকে রক্তাক্ত করবে যতক্ষণ না  তাকে  আল্লাহ বলে না মানা হবে। ছোট-বড় সবাই আমাকে বলে দিল,  দজ্জাল আমার ঈমান নষ্ট করার চেষ্টা করবে, কিন্তু আমি  যেন তার  মিঠে কথায় বা তেতো কথায় না ভুলি।   যেন আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে না যায়,   যে দজ্জালই স্বয়ং  আল্লাহতায়ালা। আমাকে দজ্জাল শত টুকরোয় কাটুক, তবু যেন অনড় থাকি। একটু নড়চড় হলেই কপালে দোযখ।

ভয়ে আমি কুঁকড়ে থাকতাম। কত কত রাত যে ঘুমোতে পারিনি দজ্জালের কথা শোনার পর। কোথাও অদ্ভুত শব্দ হলেই মনে হত দজ্জাল। মামারাও ভয় দেখাতো দজ্জালের। বোকা ছিলাম বলে আমাকে নিয়ে মামাদের দুশ্চিন্তা ছিল, দজ্জাল বোধহয় আমার ঈমান নষ্ট না করে ছাড়বে না। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘লোকটা দজ্জাল নাকি আল্লাহ, তা বুঝবো কী করে? দজ্জালও বলবে, আমি আল্লাহ, আর সত্যিকার আল্লাহ এলেও বলবে আমি আল্লাহ।’ মা কিছুক্ষণ  ভেবে বলেছিল, ‘দজ্জালের একটা চোখ, দুটো নয়’। প্রশ্ন করি ‘আল্লাহর কটা?’ মা আর উত্তর দেয়নি।




চেনা এক পীরবাড়ি থেকে প্রায়ই আমাদের কাছে  ভয়ংকর ভয়ংকর সব খবর আসতো। দজ্জাল আসার পর পরই নাকি   কেয়ামত আসবে। কেয়ামত মানে পৃথিবীর পুরো ধ্বংস হয়ে যাওয়া। মৃত মানুষগুলো সব জেগে উঠবে, আখেরাতের ময়দানে এক এক করে সবাইকে হাঁটতে হবে পুলসেরাতে। পুলসেরাত পার হতে পারলে বেহেস্ত, না পার হতে পারলে দোযখ।  এসব যত শুনতাম, তত ভয় পেতাম, ভাবতাম  দোযখের আগুনেই বুঝি আমাকে অনন্তকাল পুড়তে  হবে।

 
বছর গেল। তার পরের বছর গেল। তার পরের বছরও।  দজ্জাল কিন্তু আসেনি। কেয়ামতও আসেনি।   একটু বড় হয়ে লক্ষ্য করেছি দজ্জাল আর কেয়ামতের ভয় আমার আর নেই। বরং পীরবাড়ি থেকে ভয়ংকর সব ভয় দেখানো খবর এলে খুব হেসেছি। ওভাবেই গেছে আমার শৈশব কৈশোর।   

ধর্মের রূপকথা বিশ্বাস করি না, সে তিন যুগেরও বেশি।  মানুষের   বিশ্বাসের প্রচণ্ডতা দেখলে এখনও অবশ্য চমকে উঠি। ঠিক বুঝি না, কুসংস্কার, যুক্তিহীনতা, অজ্ঞতা, অন্ধতা নিয়ে কী করে দিব্যি মানুষ বাস করছে, শুধু বাস করছেই না, রীতিমত সুখে শান্তিতে বাস করছে।  

 মাঝে মাঝেই দেখি আমার সেই ছোটবেলায় যা ঘটেছিল তা আজও ঘটে।  কেয়ামত শুরু হওয়ার বা পৃথিবী শেষ হওয়ার আশংকাবাণী ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ছোট-বড় চেনা-অচেনা  নানা ধর্মের লোকেরা ঘোষণা করে দেয় যে আজই বা কালই পৃথিবী শেষ নিদ্রায় ঢলে পড়বে। মানুষ,  একেশ্বরবাদী হোক, বহুঈশ্বরবাদী হোক, শেষ পর্যন্ত এক।   মৃত্যুভয়ে   বড় কাতরায়। প্রস্তুতি নিয়ে নেয় শেষ দিনের, বাঁচার জন্য হেন কাজ নেই না করতে পারে।  যে দিনটি নিয়ে ভয়, সেটি কিন্তু  যথারীতি নির্বিঘ্নে পার হয়ে  যায়। নতুন আরেকটি ‘শেষ দিন’ নিয়ে আবার কিছু মানুষ মেতে ওঠে। এভাবেই চলে। চলছে।

আমেরিকার মায়া সভ্যতার আদি পঞ্জিকায় নাকি ২০১২র ২১ তারিখের পর আর  বার-তারিখ   লেখা নেই। সুতরাং এই দিনটিই, কিছু লোক ধারণা করে,          শেষের সে দিন। গুয়াতেমালায় মায়া সভ্যতার উত্তরসূরি যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তারা বলে দিল পুরোনো সভ্যতা শেষ হয়ে যাচ্ছে, নতুন সভ্যতার নতুন ভোরকেই   স্বাগত জানানো হবে। মায়ার লোকদের মধ্যে বেশি  কেউ ‘ইয়া নবসি ইয়া নবসি’ করছে না। করছে তারা যাদের সঙ্গে মায়া সভ্যতার কোনও সম্পর্ক নেই। বিশ্বের নানা প্রান্তে হাজার হাজার ভীতু ভীরু, কুসংস্করাচ্ছন্ন, বোকা, গাধা, ভেড়া দু’দিন হল পাহাড়ের চুড়োয়, নয়তো মাটির তলায় বাংকারে বসে আছে। তাদের ধারণা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, মাটির ওপরের  মানুষগুলো সব মরে ভুত হয়ে যাবে, কোথাও কিছুর আর অস্তিত্ব  থাকবে না, তারপর ধীরে সুস্থে পাহাড়ের চুড়ো থেকে আর মাটির তল থেকে বেঁচে যাওয়া  পঞ্জিকাবিশ্বাসীরা উঠে এসে  ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই নতুন জীবন শুরু করবে। কেউ আবার ভাবছে, একটা মহাশূন্যযান এসে তাদের সবাইকে উঠিয়ে নতুন কোনও উজ্জ্বল পৃথিবীতে নিয়ে যাবে। নাসার মতো বড় একটা সংস্থা এই হাবিজাবির মধ্যে নাক গলাতে বাধ্য হয়েছে।  খুব ভালো করে  বুঝিয়ে দিয়েছে যে ডিসেম্বরের একুশ তারিখে কোনও কারণ নেই পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার।  নাসার উপদেশ  শুনে ওরা হঠাৎ করে দু’দিনেই যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বনে যাবে, এমন অবশ্য আশা করি না।  


ধর্মান্ধদের অযৌক্তিক কাণ্ড  দেখে, আগেই বলেছি, বিস্মিত হই, এই কেয়ামত-বিশ্বাসী লোকদের উন্মাদনা  দেখেও বিস্মিত হই। বুদ্ধির হয়তো একটা সীমা আছে, বোকামোর, সত্যি বলতে কী,  কোনও  সীমা নেই। কেউ সব বাড়িঘর  বিক্রি করে দিয়েছে, কেউ টাকা পয়সা যা ছিল সব খরচা করে ফেলেছে, কেউ ম্যাচের কাঠি, ধুপের কাঠি, নাট বল্টু,  ছুরি চাকু, নিয়ে লুকিয়ে পড়েছে।

পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো ক্যালেন্ডারের ভবিষ্যৎবাণী আবার সত্যি সত্যি সত্যি হয়ে যায় কি না,   যে কোনও  ধর্মাবলম্বীর জন্যই এ বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।     বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটা  সভ্যতার জয়জয়কার চলবে, আর এখনকার  থোকা থোকা  জলজ্যন্ত  ধর্ম আর আর তাদের ততোধিক জলজ্যান্ত সভ্যতা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আঙুল চুষবে, তা বেশি কারও পছন্দ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই।

মাটির তল আর পাহাড়ের চুড়ো থেকে দু’দিন বাদে ফিরে এসে ওরা আমাদের সামনে ঠিক ঠিক মুখ দেখাতে পারবে তো? ঠিক পারবে, হয়তো পৃথিবী ধ্বংসের  নতুন একটা তারিখ ঘোষণা করে তবে মুখ দেখাবে। কেন একুশ তারিখে পৃথিবী শেষ হয়েও হলো না, তার একটা ভূতুড়ে কোনও কারণ  আবিস্কার করবে।   এই মায়া-ঘোষিত কেয়ামত মেনে না নেওয়ার পেছনে ধার্মিকদের  আর আমার মতো ধর্মমুক্ত মানুষদের  যুক্তি  কিন্তু ভিন্ন। কোনও এক ধার্মিক চিরতার রস খেতে পছন্দ করে না,   আমিও করি  না, তার মানে এই নয় যে আমরা ভাই ভাই।

এই কেয়ামত-বিশ্বাসীদের  আমার নিতান্তই শিশু বলে মনে হয়। শিশু-আমি যেমন ভয় পেতাম, এরাও ঠিক সেরকম ভয় পায়। বিজ্ঞান সম্পর্কে আমিও ছোটবেলায় তত জানতাম না। এরা বড়বেলাতেও জানে না। শরীরটা  বড় হয়েছে বটে, তবে এরা পৃথিবী কেন, পৃথিবী কী, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড কবে থেকে, বিবর্তন কী করে, এসব কিছুই  জানতে জানতে বেড়ে ওঠেনি। অজ্ঞতা আর অবিজ্ঞানের সঙ্গে এদের  গভীর বসবাস। তারপরও অবশ্য বেশ সুখে শান্তিতেই এরা বাস করছে। সুখ শান্তি বড় জটিল জিনিস। অনেকটা মাছের মতো। কেউ হাত বাড়ানোর আগেই   পেয়ে যায়, কেউ বড়শি হাতে সারাদিন বসে থাকে, মাছের দেখা মেলে না।

4 comments:

  1. jakhan newspaper-e ekekta RAPE-er ghatana padi(read).....takhan mone hoy prithibi dhangsa hoye jak seo barang bhalo...kintu prithibi-te r ektao RAPE-er ghatana jeno na ghate.......

    ReplyDelete
  2. The most pitiable is that the Islamist Christian or Hindu hotheads do not understand the language of logic and science but only various forms of deadly violences. Any attempt to enlighten them is nothing but 'bhaish ke age bin bazana'. The task before the enlightend humanist citizens of the world is therefore to be armed not only with the knowledge but also with gun machines for a befitting reply and protection of human civilization.

    ReplyDelete
  3. khub bhalo laglo lekha ta. manuser ogyota dekhe hasbo na matha thukbo bujhe paina. totha kothito sikhito manuserao kono protikria deina.khub bhalo lage somoyopojogi lekha gulo porte. ojosro dhonyobad.

    ReplyDelete
  4. khub bhalo laglo tomar shoishaber din gulir kotha shune,shoishobe jekono kichhuke amra nirdidhay biswas kore feli, keno na tokhon o jukti diye bichar korar moton khomota amader modhye jonmay na bole,kintu ebar 2012 r 21 the december prithibi sesh , e niye nana manusher nana mantabyo pore ba dekhe khub e koshto hoy je ekhono manush eto oggo? dharmandho o dhramamukto charidike sobaike e dekhlam mone mone kichhuta hole o shankito chhilo sobbai....shishu boyose manush onek ajgubi rupkotha shune mone mone bhoy pay mante pari, tabole prapto boyose o ?

    ReplyDelete