Tuesday, 11 December 2012

হুমায়ুন আহমেদ: পুরুষতন্ত্রের সম্রাট



হুমায়ুন আহমেদের যে ক্যানসারটি হয়েছিল, সেই একই ক্যানসার আমার মা’য়ের হয়েছিল। আমার মা মারা যান সাতান্ন বছর বয়সে, হুমায়ুন আহমেদ মারা গেছেন তাঁর চৌষট্টি বছর বয়সে। এক দশকের বেশি হল আমার মা মারা গেছেন, আর এই সেদিন মারা গেছেন হুমায়ুন আহমেদ।  আমার মা নামি দামি কেউ ছিলেন না, সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের ভয়ংকর জনপ্রিয় লেখক। হুমায়ুন আহমেদএর মারা যাওয়ার খবর শুনে আমি বিস্মিত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি মা’র কথা মনে পড়েছে, একই রকম অসুখে তিনিও ভুগেছিলেন।

নাহ,   নিউইয়র্কের স্লোন কেটেরিং বা বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসা করার সামর্থ আর সুযোগ কোনওটাই আমার মা’র ছিল না। একরকম বিনা চিকিৎসায়    তিনি মারা গেছেন। আমার মা দেশের লক্ষ লক্ষ দুর্ভাগা  মায়ের মত এক মা।   অসুখের শেষ অবস্থায় যাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়, যখন তাদের বাঁচাবার আর সময় থাকে না, আমার মা তেমন এক মা।  কোলন ক্যানসার বড় হয়ে হয়ে  খাদ্যনালী বন্ধ করে ফেললে অথবা লিভারে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে   ছড়িয়ে গিয়ে বিচ্ছিরি অবস্থা করলে কেউ হয়তো তাদের দয়া করে হাসপাতালে নিয়ে যায়, তার আগে নয়।   

  যতদিন বেঁচে থাকি আমার মা’র জন্য আমি কাঁদব, আরও শত শত মা’র জন্য কাঁদবো, চিকিৎসার অভাবে যারা মৃতু্কে বরণ করতে বাধ্য হয়।  কাঁদবো    দারিদ্র আর  পরাধীনতার শেকলে বন্দী  বাংলার সহস্র মা’র জন্য।   কাঁদবো      সেই লক্ষ কোটি অসহায় মানুষের জন্য, প্রচুর প্রতিভা  থাকা সত্ত্বেও শুধু মেয়ে জন্মানোর কারণে যাদের  অন্ধকারে পড়ে থাকতে হয়, যাদের কোনও স্বপ্নই সফল হতে দেওয়া হয়না।   

 হুমায়ুন আহমেদকে ভুগতে হয়নি, কারণ তিনি পুরুষ। তাঁকে হাঁটতে হয়নি  কোনও  অমসৃণ পথে, যে পথে প্রতিটি মেয়েকেই হাঁটতে হয়। হুমায়ুন আহমেদের জন্য    সম্ভবত আমার কষ্ট হবে না দীর্ঘদিন   কারণ হুমায়ুন আহমেদ  জীবনে যা চেয়েছেন তাই পেয়েছেন,  যা ইচ্ছে করেছেন, তাই করেছেন। রাজা হতে চেয়েছেন, রাজা হয়েছেন। বাদশাহী উপভোগ করতে চেয়েছেন, উপভোগ করেছেন। পৃথিবীর খুব কম মানুষই জীবনে এত ভোগ বিলাশ করার সুযোগ পান। খুব কম মানুষই নিজের যাবতীয় স্বপ্নকে সফল করার সৌভাগ্য অর্জন করেন।   এই জীবনে কে কার চেয়ে বেশি যশ আর খ্যাতি লাভ করতে পারে, তার একটা ভীষণ প্রতিযোগিতা চলে। হুমায়ুন আহমেদ সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশে যারা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত, তাদের হাজার  মাইল পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে ছিলেন। তার নাগাল কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর মতো সৌভাগ্যবান মানুষ আমার জীবনে আমি আর দেখিনি। তিনি চলে গেছেন। এরকম  সবাই যাবে, কেউ দুটো বছর আগে যাবে, কেউ দুটো বছর পরে। এই সম্ভাবনা আমার মনে হয় না খুব বেশি ছিল যে বেঁচে থাকলে তিনি নতুন ধরণের কোনো লেখা লিখতেন বা সাহিত্য জগতকে বিশাল কিছু দান করতেন। আমরা মানুষটিকে হারিয়েছি, এটাই যা ক্ষতি, তাঁর চলে যাওয়ায় সত্যি বলতে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতের কোনও ক্ষতি হয়নি।

হুমায়ুন আহমেদের লেখা আমি পড়তাম আমার কিশোরী বয়সে। যখন থেকে আমি বাংলায় এবং অন্যান্য ভাষায় উন্নতমানের সাহিত্য পড়তে শুরু করেছি, হুমায়ুন আহমেদ পড়া আমার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি, এবং যখন থেকে আমার ভালো নাটক দেখার রুচি  গড়ে উঠলো, আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি হুমায়ুন আহমেদের নাটক দেখা। কিন্তু কী করে লক্ষ লক্ষ মানুষ হুমায়ুন আহমেদের  শত শত রম্য-রচনা পড়ে গেছে যুগের পর যুগ? এর উত্তর হতে পারে, তারা রম্য- রচনারই পাঠক, রম্য-রচনা ছাড়া আর কোনও রচনার যোগ্য নয় তারা,  অথবা পাঠক হিসেবে তাদের বিবর্তন ঘটেনি, অথবা    অল্প শিক্ষিত বলে হুমায়ুন আহমদের বই আর নাটকের  ছোটো ছোটো সুখ দুঃখ আর সহজ সরল কৌতুক  বোঝা তাদের জন্য বড় সুবিধের।  বাংলাদেশের জনগণ যদি এত বিপুল পরিমাণে অশিক্ষিত আর অর্ধশিক্ষিত না হত, হুমায়ুন আহমেদের পক্ষে এত প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা অর্জন করা সম্ভব হত না।   বাংলার  প্রকাশকরা,   হুমায়ুনের বন্ধু সাহিত্যিক সুনীলগঙ্গোপাধ্যায়-সমরেশমজুমদাররা বছরের পর বছর প্রবল চেষ্টা করেও পাশের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে হুমায়ুন আহমেদকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারেননি। এর কারণ সম্ভবত একটিই, ওই রাজ্যে শিক্ষিতের মানটা বাংলাদেশের   তুলনায় সামান্য বেশি।

হুমায়ুন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় তিনি  বেজায়রকম বিখ্যাত হওয়ার আগে। তাঁর যে গুণটি আমার প্রথমেই চোখে পড়েছে, তা হল তিনি  গল্প বলে ঘরোয়া আসর জমিয়ে রাখতে পারেন। অসাধারণ স্টোরি টেলার। একবার তিনি  আমাদের ময়মনসিংহের বাড়িতে হঠাৎ চলে এলেন। বললেন, নেত্রকোণা গিয়েছিলেন, ঢাকায় ফেরার পথে ভাবলেন আমার সঙ্গে দেখা করে যাবেন।  আমাদের বাড়িটা কল্পনা করে নিয়েছেন ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে একটা লাল বাড়ি। সেই কল্পনার বাড়িটা তিনি খুঁজছিলেন, যত লাল বাড়ি আছে নদীর পাড়ে,   দরজা ধাক্কিয়ে বাড়ির লোকদের ডেকে এনে  জিজ্ঞেস করেছেন, আমি আছি কি না। শেষে নাকি তাঁর রিক্সাওয়ালাই নিয়ে এসেছে ঠিক বাড়িটিতে। সারাদিন ছিলেন হুমায়ুন আহমেদ। একাই গল্প বলে গেলেন, বাড়ির সবাই মুগ্ধ হয়ে হুমায়ুন আহমেদর গল্প শুনে ছিলআমার বিশ্বাস তিনি যদি সারারাতও ঠিক ওভাবে গল্প বলে যেতেন, সবাই মুগ্ধ হয়ে ওভাবেই শুনতো আর থেকে থেকে ঘর ফাটিয়ে হেসে উঠতো। হাসাতে জানতেন।  অনেক গুণ ছিল হুমায়ুন আহমেদের।   ইস্কুলের সিলেবাসের বাইরে    কোনও বই পড়ার অভ্যেস যাদের নেই ,   সেসব   মানুষকে তিনি তাঁর বই পড়িয়ে ছেড়েছেনএমন অনেকে আছে জীবনে একটিই ‘গল্পের বই’ পড়েছে, গল্পের বইটি হুমায়ুন আহমেদের। একসময় ভাবা হত, হুমায়ুন আহমেদ পাঠক তৈরি করেছেন। তাঁর   বই পড়ে পড়ে  পাঠকের বই পড়ার অভ্যেস গড়ে উঠবে, বোধোদয় হবে, রুচি পাল্টাবে, তখন আর হুমায়ুন আহমেদ না পড়ে অন্য লেখকের বই পড়বে। ভাবনাটি ভুল ছিল। হুমায়ুন আহমেদ পাঠক তৈরি করেছেন বটে, তবে সেই পাঠককে জীবনভর নিজের বই পড়ার জন্যই তৈরি করেছেন, অন্য কারও বই পড়ার জন্য নয়। তাঁর পাঠককূল খুব কমই বিবর্তিত হয়েছে।

 হুমায়ুন আহমেদের ‘নেই’কে  ‘নাই’ লেখাটা আমাকে বরাবারই বড় পীড়া দিয়েছে। জানিনা পরে তিনি ‘নাই’ এবং আরও কিছু ভাষার দোষ কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন কি না।    অর্ধশিক্ষিত পাঠকদের  জন্য পৃথিবীর সব দেশেই কিছু লেখক আছেন, তাঁদের কাজ  চটুল বই লেখা। তাঁদের প্রায় সবারই মান    হুমায়ুন আহমেদের চেয়ে অনেক ওপরে। স্টিফেন কিং, টেরি প্র্যাটচেট। বাংলা ভাষার লেখক ‘শংকর’-এর চটি বইয়ের মানের কথাই ধরা হোক না কেন।   ভাষার তুলনা চলুকশংকর অনেক  ওপরে।  ভাষায় দক্ষতা না থাকলে ভালো সাহিত্যক হওয়া যায়না। ঘরোয়া  আসর মাতিয়ে রাখতে পারা বা   প্রকাশকের চাপে এক সপ্তাহে বা দু’রাত্তিরে  একটা বই লিখে ফেলতে পারা বা তিন দশকে বইয়ের সংখ্যা তিনশ’র বেশি করে ফেলতে পারা—এসব বড় সাহিত্যক হওয়ার গুণ নয়।    আজ অবশ্য অনেকে হুমায়ুন আহমেদকে ‘বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কথা সাহিত্যিক’ ইত্যাদি বলছেন। বাংলা ভাষা এবং এর সাহিত্যকে এই অপমানটি কি না করলেই নয়? ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’-এর কথাও উঠছে। আহ, ওরা যদি জানতো ম্যাজিক রিয়ালিজম ঠিক কাকে বলে! গরু ছাগলকে দিয়ে কথা বলানো ম্যাজিক রিয়ালিজম নয়।

আরও একটি ব্যাপারে আমি বিস্মিত হই। হুমায়ুন আহমেদের মতো বুদ্ধিমান লোক স্ত্রী পুত্র কন্যা   ফেলে গোঁড়ালির বয়সী একটা মেয়েকে কেন বিয়ে করেছিলেন!  দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি দেখেছি, তা আমাকে ততটা বিস্মিত করেনি, তা হল মিডিয়ার মুখ বুজে থাকা। মিডিয়া চিরকালই ক্ষমতার দাস। খুব কম মিডিয়াই নিরপেক্ষ হওয়ার এবং সত্য কথনের  সাহস দেখাতে পারে।    আমি বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হাড় মজ্জা অবধি চিনি। ওই সমাজে আমি বড় হয়েছি, ওই সমাজ আমার  সঙ্গে কারও সম্পর্কের বা বিয়ের গুজব শুনেই হায়েনার মতো দৌড়ে এসেছে আমাকে আক্রমণ করতে। আমার বিরুদ্ধে বিস্তর মিথ্যে কথা রটিয়ে   মিডিয়ার বিস্তর আমোদ জুটেছে। আমিও জনপ্রিয় লেখক ছিলাম এককালে। আমি যদি আমার   স্বামী সন্তান সংসার ত্যাগ করে আমার পুত্রের কোনও বন্ধুকে বিয়ে করে তাকে  নিয়ে কোনও  বাগান-বাড়ি বানিয়ে বাস করতে শুরু করতাম, লোকে আমাকে আক্ষরিক অর্থে   ছিঁড়ে   ফেলতো, আক্ষরিক অর্থেই কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে রাখতো রাস্তায়, আগুনে পুড়িয়ে মারতো অথবা পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলতো অথবা জ্যান্ত কবর দিয়ে দিত। কারও আমার বই পড়ার তো প্রশ্ন ওঠে না। শুধু আমি নই, অন্য কোনও মেয়েকেও একই রকম করতো এই নষ্ট সমাজ।  কোনও অন্যায় না করেও দেশ হারানোর শাস্তি আমি পোহাচ্ছি,  অন্যায় করলে পরিণতি কী হত, তা আমি বেশ অনুমান করতে পারি।  নারীর মুক্তির জন্য আর মানবাধিকার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করে গেছি, নিরন্তর লিখে গেছি। আর আমাকেই কিনা দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।  আমার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য জঘন্য  অন্যায় যারা করেছে, যারা আমার মাথার দাম ঘোষণা করেছে, তাদের দিব্যি দুধ কলা দিয়ে পোষা হচ্ছে, আর  দেশ থেকে জন্মের মতো তাড়ানো হয়েছে  আমাকে!  আজ উনিশ বছর আমাকে দেশে ফিরতে দেয় না কোনও সরকার। মুখ বুজে মজা দেখছে দেশের   তথাকথিত জ্ঞানী গুনী পণ্ডিত এবং মানবাধিকারের পক্ষে লড়াই করা হিপোক্রেটস।  লেখক গোর ভিডাল বলেছিলেন,  ‘ভালো কাজের  সবসময় একটা  শাস্তি পাওনা থাকে’।   মিডিয়া যদি পুরুষতান্ত্রিক না হত,   আমার  বিরুদ্ধে সরকারের অগুনতি  অন্যায়ের প্রতিবাদ করতো। যেহেতু সমাজ পুরুষতান্ত্রিক, মিডিয়াও পুরুষতান্ত্রিক, সে কারণে হুমায়ূন আহমেদ সমালোচিতও হন না,  নিন্দিতও হন না বত্রিশ বছরের সংসার ভেঙে সন্তানের বন্ধুকে বিয়ে করার পরও। মিডিয়া তাঁকে ‘নিন্দিত’ হওয়ার কোনও সুযোগই দেয়নিশুরু থেকে শেষ অবদি তাঁকে সম্বোধন করে গেছে ‘’নন্দিত লেখক’ বলে। বাংলাদেশের   মিডিয়া এবং মানুষ প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক বলে হুমায়ুন আহমেদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে  চরমতম নিন্দার কাজ করেও জীবনভর ‘নন্দিত’ থেকে যাওয়া। 

হুমায়ুন আহমেদ নিজে ছিলেন পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী। তাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাঁর ছিল এত আদর। সমাজের নারী-বিদ্বেষী পুরুষতান্ত্রিক চরিত্র আরও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে  হুমায়ুন আহমেদ মারা যাওয়ার পর। গুলতেকিন হুমায়ুন আহমেদের শোক সভায় এসে কেঁদেছেন, এই কান্নার জন্য তাঁকে মহিয়সী রমণী খেতাব দেওয়া হচ্ছে। স্বামী লোচ্চামি, বদমাইশি  যা খুশি  করুক,   তুমি স্বামীকে নিরবধি শর্তহীন ভালোবেসে যাও স্বামী সাত জনের সঙ্গে শুয়ে বেড়াক, হাজার হলেও পুরুষ তো, মেয়ে হয়ে জন্মেছো, তুমি ভাই সতী সাধ্বী থেকে যেও। স্বামী তোমাকে লাথি দিলেও তুমি স্বামীর জন্য কেঁদে বুক ভাসিও। স্বামী তোমাকে ছেড়ে চলে গেলেও, অন্য কারও সঙ্গে বাকি জীবন রং তামাশা করলেও স্বামীর যে  কোনও প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িও,   সমাজ তোমাকে বাহবা দেবে।    আমরা ভোগ করবো, তোমরা আমাদের ভোগের বস্তু হবে, বা আমাদের ভগবান জ্ঞান করবে,  বা আমাদের স্তুতি গাইবে, আমাদের মঙ্গলের জন্য জীবনপাত করবে। এই না হলে তোমরা আর মেয়ে কেন!  হুমায়ুন আহমেদের সন্তানের বয়সী স্ত্রী নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তুচ্ছ করে    স্বামীর সেবা করে গেছে, অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে তাঁকে সুস্থ করে তোলার  জন্য, তাকেও অনেকে বাহবা দেবে। কেউ কেউ আবার কোনও ত্রুটি খুঁজে পেলে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেবে   স্বামী-দেবতার সেবায় একটু এদিক ওদিক হলে যে রক্ষে নেই!  

ক’দিন আগে আমার এক বন্ধু হুমায়ুন আহমেদের একটা লেখা. তাঁর তিন কন্যাকে নিয়ে, পড়তে দিল আমাকেকন্যাদের সম্ভবত প্রায় দশ বছর পর তিনি দেখেছেন,    আমি ভেবেছিলাম   পিতা হয়ে যে অন্যায় তিনি করেছেন তার জন্য ক্ষমা চাইবেন। আবেগে কাঁপবে তাঁর কলম। কিন্তু তা নয়, পুরো লেখাটিতেই নিজের গুণগান গেয়েছেন। তিনি নিজে খুব   মেধাবী, তাঁর জিন পেয়েছে কন্যারা,  সে কারণে তাঁর কন্যারাও মেধাবী। আমি তাজ্জব! হৃদয় বলে কিছু কি ছিল না হুমায়ুন আহমেদের! দেখতে শুনতে গ্রামীন, সরল সোজাকিন্তু ভেতরে খুব কঠিন একটি মানুষ। নির্বিকার। নিজের সুখ আনন্দ  ছাড়া দুনিয়ার অন্য কিছু থোড়াই হয়তো কেয়ার করেছেন। জনপ্রিয়তা তাঁকে আকাশে বসিয়ে দিয়েছিল, তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান না করলেও বড় তুচ্ছ কিছু একটা জ্ঞান করেছিলেন, ধরার মানুষগুলোকেও হয়তো তা-ই করেছিলেনকোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছিলেন, ক’টা টাকা দেশের মানুষের দারিদ্র দূর করতে, অশিক্ষা, কুশিক্ষা দূর করতে খরচ করেছিলেন? ক্যানসার হাসপাতাল করবেন, ক্যানসার না হলে বলতেন? নিজের শরীরে বড় রোগ ধরা পড়লে ভয়ে ভয়ে সব লোকই মানত করে, এই গড়বো, সেই বানাবো।    

যে কন্যারা অভিমানে দূরে সরে ছিল, কারণ তাদের পিতা তাদের গড়ে তোলার চেয়েও  বৃদ্ধ বয়সে এক কন্যাসম কিশোরীর  সঙ্গে    স্বপ্নের ফানুস ওড়ানোটাকেই  যৌক্তিক বলে মনে করছিলেন, সেই কন্যারা অসুখের খবর শুনে কাছে এলে মিডিয়া খুশি হয়, মানুষ খুশি হয়। ক্ষমতাবানের সামনে সকলে নত হয়সে বেঁচে থাকলেও হয়, সে মরে গেলেও হয়পুরুষের ক্ষমতা বলে কথা। সাফল্যের মুখ পুরুষের মুখ।  যাদের একসময় পায়ে  ঠেলে দিয়েছিলে তুমি , তারাই এখন তোমার পায়ের কাছে এসে কাঁদছে।  কারণ তুমি পুরুষ,   তুমি ধনী, তুমি জনপ্রিয়, তুমি রাজা, তুমি বাদশাহ, তুমি সম্রাট, তোমার সাত খুন মাপ।

  হুমায়ুন আহমেদ অনেকটা  ঈশ্বরের মতো। নিজের কারণে নয়,  ঈশ্বরভক্তদের কারণেই  ঈশ্বর টিকে আছেন 

10 comments:

  1. " তাঁর যে গুণটি আমার প্রথমেই চোখে পড়েছে, তা হল তিনি গল্প বলে ঘরোয়া আসর জমিয়ে রাখতে পারেন। অসাধারণ স্টোরি টেলার। "
    --- মানুষ নিরংকুশ ভালো হতে পারে না। তার এই শক্তিটা আমি শ্রদ্ধা করি। আপনার মায়ের কথা বললেন। তার জন্য হুমায়ুন আযাদ দ্বায়ী নন। অনেক পুরুষ গরীব হলেই একি সমস্যায় পরে । সমস্যা অসম বনটনের ।
    -------------------------------------------

    "স্বামী লোচ্চামি, বদমাইশি যা খুশি করুক, তুমি স্বামীকে নিরবধি শর্তহীন ভালোবেসে যাও। স্বামী সাত জনের সঙ্গে শুয়ে বেড়াক, হাজার হলেও পুরুষ তো, মেয়ে হয়ে জন্মেছো, তুমি ভাই সতী সাধ্বী থেকে যেও। স্বামী তোমাকে লাথি দিলেও তুমি স্বামীর জন্য কেঁদে বুক ভাসিও।"

    আমার মেয়েকে, বোঙ্কে আমি এই যায়গা থেকে বের করে আনব । এই অসুখ নারীর । দোষ যারি হোক । কথা হল আরোগ্য চাই।
    -------------------------------------------
    " যে কন্যারা অভিমানে দূরে সরে ছিল, কারণ তাদের পিতা তাদের গড়ে তোলার চেয়েও বৃদ্ধ বয়সে এক কন্যাসম কিশোরীর সঙ্গে স্বপ্নের ফানুস ওড়ানোটাকেই যৌক্তিক বলে মনে করছিলেন, সেই কন্যারা অসুখের খবর শুনে কাছে এলে মিডিয়া খুশি হয়, মানুষ খুশি হয়। ক্ষমতাবানের সামনে সকলে নত হয়। সে বেঁচে থাকলেও হয়, সে মরে গেলেও হয়। পুরুষের ক্ষমতা বলে কথা। সাফল্যের মুখ পুরুষের মুখ। যাদের একসময় পায়ে ঠেলে দিয়েছিলে তুমি , তারাই এখন তোমার পায়ের কাছে এসে কাঁদছে। কারণ তুমি পুরুষ, তুমি ধনী, তুমি জনপ্রিয়, তুমি রাজা, তুমি বাদশাহ, তুমি সম্রাট, তোমার সাত খুন মাপ।

    হুমায়ুন আহমেদ অনেকটা ঈশ্বরের মতো। নিজের কারণে নয়, ঈশ্বরভক্তদের কারণেই ঈশ্বর টিকে আছেন। "

    তার মৃত্যু অন্যেরা যেভাবেই দেখুক তার নিজের মা পর্যন্ত এই বিক্রিতকামে অসন্তুষ্ঠ ছিলেন। আমি আর মাও তাই । গুলতেকিনের সাথে তিনি অন্যায় করেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু তাই বলে তিনি লেখক খারাপ ছিলেন না। নাট্যকারো মন্দ নন। তার শেষ চলচ্চিত্রটি আমার খুব ভালো লেগেছে। আপনি কি দেখেছেন ? ঘেটুপুত্র কমলা ?

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমার মা বড় হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারেনি, সে কারণে আমি তো হুমায়ূন আহমেদকে দায়ী করিনি! আমার মা’র একই রকম ক্যানসার ছিল বলে মা’র কথা মনে পড়েছে। দ্যাটস অল।

      Delete
  2. Apni Bangali der onek osanman korcen ai lekhai..Apni ai desh r desh ar manus k insult korcen but bolen ai desh k apni valobasen..hasailen...

    ReplyDelete
  3. Namaskar Didi, prathome bhalobasha niben. ami matro 1-2 mash holo, aponar aatmo-jiboni r prathom tin ta khondo (aamar meyebela, uthal haowa & dwikhanditto)parlam, tao net theke download kore. tobe, 'Lajja' 1994 ei pare chilam j tar khub kichu e ekhon mone aache. Jai hok, auto biography book gulo pare ami aapnar lekhar gabhir prem e porlam, bishesh kore sei gulo te j dharaner jiban-japan, khela-dhula, pasher bari theke dudh-chini dhar kora,.......,bishoy e likhechen ta amader moto nimno-madhyabitto paribar gulo te ekhon o ghote thake and sei sab pore nijer choto belar katha bar bar choke bhese aschilo. Book gulo eto e bhalo laglo j sathe sathe twitter e aapnake follow karte laglam, face book er page like korlam, Face Book ghete apnar nijee, abakash er, Maa r, bon er, dada der, bhatija der, poet Rudra r sathe sada sari pore Dhaka r rastai tola apnar photo....etc. etc. sab dekhlam. Jadi o akhkhep theke gelo j, na aapnar Babar kono photo dekhte pelam, na unar bishoye aar kichu jaante parlam. Asha rakhlam j, ei post er reply e unar sesh-jibon er bishay amake janaben. Recently aapnar kichu kichu blog o pora suru korlam and aaj e Muktobhabna te Humayun Ahmed k niye bangla te lekha blog ta parlam and jante parlam j aapnar Ma mara gechen. Ek kothai bolte gele, ami matro 1-2 mash theke e aapna k chini,j ta k masala lagiye bolte gele bolbo j ami recently apnar fan hoyechi. Tobe j aapnar kichu e amar kharap lage nai ta na, next post e ta likhbo.amar moto sadharan pathok er eto boro lekha te bhasagato bhul thakar to adhikar aachei, ta mene niye kosto kore porar jonno dhanyobad.....

    ReplyDelete
    Replies
    1. Onek dhonyobad. PBS theke ber howa boi gulo poRte parle bhalo hoto, online theke je manuscript poRecho, ta bodhoy draft copy.

      Delete
  4. আপনি লিখেছেন, আমি বিস্মিত হই। হুমায়ুন আহমেদের মতো বুদ্ধিমান লোক স্ত্রী পুত্র কন্যা ফেলে গোঁড়ালির বয়সী একটা মেয়েকে কেন বিয়ে করেছিলেন!

    ব্যাপারটা কি গোঁড়ামী চিন্তা যুক্ত হয়ে গেল না? কেউ তার পছন্দের নারীকে বিয়ে করতে পারবেনা শুধুমাত্র বয়সের পার্থক্যের কারনে?

    আবার বলা যায় হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন আস্তিক,তিনি ইসলাম ধর্মের নীতি অনুসরণ করে শাওনকে বিবাহ করেছেন বয়স কম দেখে যেমনটা করেছিলেন তাদের নবী মুহম্মদ। এখানে আপনার সমালোচনার বিষয়বস্তু হতে পারত হুমায়ূনের ধর্ম। কিন্তু আপনি সেরকম কোন ইংগিত করেননি বরং আপনার ব্যক্তিগত অভিরুচি দিয়ে হুমায়ূন-শাওনের সম্পর্ক মূল্যায়ন করেছেন। আপনার সমালোচনার বিষয়বস্তু ধর্ম হতে পারত এটা বলেছি কারন আপনি নিজেকে মুক্তচিন্তক মনে করেন যেটা এই ব্লগের নাম।

    ReplyDelete
  5. 'নেই' কে 'নাই' বলা যাবেনা। এটা কি সাহিত্যিক হওয়ার অত্যাবশ্যকীয় সূত্র যা মেনে চলতে হবে? বাস্তবে যদি মানুষ 'নাই' উচ্চারণ করে সাহিত্যের কোন চরিত্র সেটা পারবেনা কেন? সাহিত্য কি বাস্তবতা বর্জিত? বাস্তবতা থেকে সাবজেক্ট নিবে আর ব্যাকরণ হবে অবজেক্ট?

    ReplyDelete
  6. Excellent Taslima, also mention that he contributed 6 children to overly populated Bangladesh, Anisul Haq, Farooki they are new Humayun Ahmed.

    ReplyDelete
  7. আপনি লিখেছেন, আমি বিস্মিত হই। হুমায়ুন আহমেদের মতো বুদ্ধিমান লোক স্ত্রী পুত্র কন্যা ফেলে গোঁড়ালির বয়সী একটা মেয়েকে কেন বিয়ে করেছিলেন! ami thik buste parsi na apni keno swa birodi kotha bolen ,apni jekono somorkoke support koren , ekahane ultota korlen;

    ReplyDelete
  8. Taslima, ei lekhatir jonyo dhonyobad r abhinandan. apanar moto sposhto nirvik lekha sottyi durlov.

    ReplyDelete