Monday, 13 May 2013

অ্যালবাম২






মেলবোর্নের গ্লোবাল এথিস্ট কনভেনশনে (২০১০) বক্তৃতা করছি। দর্শকের সারিতে তিল ধারণের জায়গা নেই। কয়েক হাজার দর্শক,    সকলেই টিকিট করে বক্তৃতা শুনতে এসেছেন।  অস্ট্রেলিয়ার নানা অঞ্চল থেকে, এবং  ইওরোপ/ আমেরিকা থেকে আসা শিক্ষিত সচেতন ধর্মমুক্ত, একই সঙ্গে  মানববাদী, নারীবাদী। এই মানুষগুলো আমাকে শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। এই মানুষগুলো আমার মতের সঙ্গে একশ' ভাগ একমত। এঁদের সঙ্গেই আমি নিরাপদ বোধ করি।  এঁদেরই আমি মনে মনে দেশ বলে বা স্বদেশ বলে ডাকি।





মেলবোর্নে আমাদের   কনভেনশন  শেষ হলে  অস্ট্রেলায়ান হোস্ট   তানিয়া স্মিথের  বাড়িতে সন্ধেয়  আমাদের পানাহারের নেমন্তন্ন ছিল।  যখন ওদের বাগানে ছবি তোলার ডাক পড়লো, আমাকে বলা হল  রিচার্ড ডকিন্স আর পিজি মায়ার্সের মাঝখানে বসতে। এর চেয়ে চমৎকার প্রস্তাব আর কী  আছে জগতে? আমাকে কেন বলা হয়েছিল পৃথিবী বিখ্যাত  দুই বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানীর সঙ্গে বসতে, আমি কি   আদৌ তাঁদের ধারে কাছে আসার যোগ্যতা রাখি? সম্ভবত, সেদিন, মেলবোর্ন কনভেনশনে  আমি দর্শকদের স্ট্যান্ডিং অভেশন পেয়েছিলাম  বলে! আমি ছাড়া কোনও স্পিকার ওই  কনভেনশনে ঠিক ওরকম ব্যাপক স্ট্যান্ডিং অভেশন পাননি বলে! অস্ট্রেলিয়ার এথিস্ট কমিউনিটি আমাকে নিয়ে  রীতিমত উত্তেজিত। সকলের অনুরোধে এবং উৎসাহে আমি বসেছিলাম আমার দুই প্রিয় মানববাদী বিজ্ঞানীর মাঝখানে। 

 ছবি তোলা হল। আড্ডা হল। রিচার্ড ডকিন্স আর পিজি মায়ার্সের   সঙ্গে আরও অনেক অনুষ্ঠানে আমার দেখা হয়েছে। কিন্তু ওভাবে হৈ হৈ করে ছবি তোলা হয়নি মেলবোর্নের মতো। দু’জনের মাঝখানের আসনেও ওরকম আর বসা হয়নি।   ওয়াশিংটন ডিসির রিজন র‍্যালিতে কথা হল রিচার্ড ডকিন্সের সঙ্গে। তার আগের রাতে ডিনারেও।  রিজন র‍্যালিটা ছিল খুব বিশাল।  পঁচিশ হাজার মুক্তচিন্তার মানুষ  বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শুনেছে আমাদের বক্তৃতা। তুমুল ঝড় বৃষ্টিও  ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল মল থেকে কাউকে একচুল নড়াতে পারেনি। 



পিজি মায়ার্সের সঙ্গে এরপর নরওয়ের  হিউ্ম্যানিস্ট কনভেনশনে (২০১১) দেখা হল, আড্ডা হল। নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটি আমাদের নোবেল মিউজিয়ামে ডিনার খাওয়ালো। ডিনারে আমার আর পিজির সামনে বসেছিলেন  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান। বুদ্ধিমান লোক, কিন্তু এই হিউম্যানিস্ট কনফারেন্সে তিনি কেন। প্রথমে অত পাত্তা দিইনি। কিন্তু ভদ্রলেকের সেন্স অব হিউমার আমাকে বেশ আনন্দ দিয়েছিল।  ভারতের উদ্বিগ্ন কর্তরা নাকি ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত দেশের লিস্টে ভারত অন্তত পাকিস্তানের ওপরে আছে কি না, ওপরে থাকলেই খুশি, দুনিয়ার আর সব দেশের নিচে থাকলেও ক্ষতি নেই, শুধু পাকিস্তানের নিচে না থাকাটাই  ভীষণ জরুরি।

 পিজির সঙ্গে     রিজন র‍্যালিতেও আড্ডা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আড্ডা হয়েছে জার্মানির কোলনে, ইওরোপিয়ান এথিস্ট কনভেনশনে (২০১২)।  কনভেনশনের আগের রাতে সেই যে জার্মানির বিখ্যাত বিয়ার পান শুরু হল, কনভেনশন শেষ হওয়াতক সেটি প্রধান খাদ্যরূপে চললো। আমি বিয়ারে অভ্যস্ত নই। কিন্তু ভালো সঙ্গী জুটলে তেতোবিষও নির্ভাবনায় গেলা যায়।



নিতান্তই খুব প্রয়োজনে কনফারেন্স রুমে গিয়েছি, বাকিটা সময় রুমের বাইরে খোলা বিয়ার বাগানে আড্ডা। আমি, পিজি, রেবেকা। মাঝে মাঝে কেউ কেউ  আড্ডায় ঢুকেছে, আড্ডা থেকে  বেরিয়েছে।

পিজি অসম্ভব বিয়ার ভালোবাসেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডাও দিতে পারেন  আড্ডাবাজ বাঙালির মতো। রিচার্ড ডকিন্সের লেখা আমার ভালো লাগে। পিজি মায়ার্সের লেখাও। কিন্তু আড্ডা দিতে হল আমি রিচার্ড ডকিন্সকে নয়,  পিজিকেই বেছে নেব।


 রিচার্ড ডকিন্স সুদর্শন  ইংলিশ ভদ্রলোক, রেবেল। পিজিও রেবেল, তবে দেখতে যেমনই হোন না কেন, পিজির রসবোধ প্রচণ্ড। আড্ডায় এটিরই প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। পিজি মানুষ হিসেবেও বেশ বড়। কেবল কি বড় আড্ডাবাজ হলেই চলে, বড় মানুষও হতে হয়।

Sunday, 12 May 2013

আগুন নিয়ে কবিতা

অনেকদিন কবিতা লিখি না। না লিখতে লিখতে জীবন যেন কেমন গদ্যময় হয়ে উঠছে। দু'দিন আগে আগুন নিয়ে একটা কবিতা লিখলাম।


অগ্নি  


ক.
কাল রাতে হঠাৎ আগুন লেগেছিল ঘরে।
অনেকদিনের ঠাণ্ডা শরীর,
তাপ-উত্তাপ ভুলে যাওয়া ঠাণ্ডা শীতল শরীর,
না-স্পর্শ না-ছোঁয়া ঠাণ্ডা শরীর,
ওই শরীর কাল স্পর্শ করেছিল আগুন।

স্পর্শকে আসকারা দিলে যা হয়, হাত পা ছড়াতে ছড়াতে বড় হতে থাকে।
বড় হতে হতে ঠোঁটের নাগাল পায়।
আগুনের লকলকে জিভ কী-করে-কী-করে যেন ঠোঁটের নাগাল পেয়েছিল কাল।
আগুন আমাকে চুমু খেয়েছিল কাল।
আগুন আমার চিবুকের বুকের পিঠের পেটের যৌনাঙ্গের উরুর
নাগাল পেয়েছিল  কাল।

পুড়ে যেতে ইচ্ছে করেছে ঠোঁট,  কিন্তু পোড়েনি,
পুড়ে যেতে ইচ্ছে করেছে শরীর, কিন্তু পোড়েনি,
ছিটে ফোঁটা আগুন শেষঅবধি  কিছুই পোড়াতে পারেনি আমার।

পুড়ে যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু পুড়ে গেলে  ছাই হয়ে যাবো,   
কে চায় জেনে বুঝে ছাই হতে! কতই বা ছাই হতে পারে একা একা
একাকী নির্জন মানুষ!  

আগুনের সঙ্গে ও ছিল নিতান্তই  আমার শরীর শরীর   খেলা।
সামান্য একটু আগুন, মধ্য রাতের আগেই কী রকম দপ করে নিভে যায়,
হেরে যায়।
নিজেকে ঢুকিয়ে নিয়ে   নিজের  খোলসে,
আগুন চলে যায়, চারদিক অন্ধকার করে  চুপচাপ  বাড়ি চলে যায়।


খ.
এখনও জানি না ও আসলে আগুন ছিল নাকি  আগুনের আঁচ।
আগুন নয়, আগুন কি কখনও কাউকে না  পুড়িয়ে ছাড়ে!
সম্ভবত আগুনেরই আঁচ, আর ওকেই আগুন ভেবে মনে মনে পুড়তে চেয়েছি আমি!


কে জানে    আমারই আঁচ ছিল কি না,  আমার আগুনের!  
এক শরীর আগুন সেই কবে থেকে   মর্গে পড়ে আছে,
আমিই হয়তো একটু একটু করে ঘুম ভাঙিয়েছি,
আমিই হয়তো আমার  আগুন ছুঁইয়ে ওকে আগুন করতে চেয়েছি,
আমিই হয়তো চেয়েছি ও আমাকে পোড়াক,
কিন্তু কী করে পোড়াবে ও, আগুনের মতো দেখতে শুনতে বটে,
সত্যিকার আগুন তো নয়!


----------
প্রায় ন'বছর আগে আগুন নিয়ে আরও একটি কবিতা লিখেছিলাম! তখনও দেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ। কলকাতার দরজা সবে খুলেছে।  কবিতাটি হারভার্ডের  কেনেডি ইস্কুলে বসে লেখা।    এক শীতে বরফে ডুবে আছি, তখন। 

তুষারের ঝড়ে

হঠাৎ কে যেন আমাকে ছুঁড়ে দিল আমাকে তুষারের ঝড়ে, 
যতদূর চোখ যায়, যতদূর যায় না, চোখ ধাঁধানো সাদা, শুধু সাদা, শুধু সাঁ সাঁ
উদ্বাহু নৃত্য চলছে তুষার-কন্যার, শুকনো পাতার মতো আমাকে ওড়াচ্ছে। 
পাকে ফেলে খুলে নিচ্ছে গা ঢাকার সবক'টা কাপড়। 
আমার চুখ চোখ, 
আমার সব, 
আমার সর্বাঙ্গ ঢেকে গেছে তুষারে। 
আকাশ নেমে এসেছে একেবারে কাছে, ছুঁতে নিলেই 
জীবন্ত একটা ডাল খসে পড়লো, 
আকাশ এখন আর আকাশের মতো নয়, 
মুখ থুবড়ে সেও পড়েছে ঝড়ে। 
দু'একটি গাছ হয়তো ছিল কোথাও, ভেঙে ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে তুষার স্তূপে, 
প্রকৃতির কাফন আমাকে মুড়িয়ে নিয়ে ঢুকে যাচ্ছে কোথাও, কোনও গর্তে। 
ঠোঁটদুটো কাঁপছে আমার, কান লাল হয়ে আছে, নাকে গালে রক্ত জমে আছে, 
হাতের আঙুলগুলো সাদা, হিম হয়ে থাকা সাদা, 
আঙুলগুলোকে আঙুল বলে বোধ হচ্ছে না, কয়েক লক্ষ সুঁই যেন বিঁধে আছে আঙুলে, 
আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না, কিছুকে দেখতে পাচ্ছি না, 
সব সাদা, মৃত্যুর মতো, নৈঃশব্দের মতো, চন্দ্রমল্লিকার মতো, 
একটু  একটু করে রক্তহীন হচ্ছে ত্বক, 
একটু একটু করে তীব্র তীক্ষ্ণ শীতার্ত দাঁত আমাকে খেতে খেতে খেতে খেতে 
আমার পা থেকে হাত থেকে উরুর দিকে বাহুর দিকে হৃদপিণ্ডের দিকে উঠে আসছে, 
উঠে আসছে। 


আমি জমে যাচ্ছি
জমে যাচ্ছি আমি
গোটা আমিটি 
বরফের 
একটি 
পিণ্ড 
হয়ে 
যাচ্ছি....


ও দেশ, ও কলকাতা, একটু আগুন দিবি? 





Sunday, 14 April 2013

পয়লা বৈশাখের উৎসব দুই বাংলায় একই দিনে হোক





পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে  বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখের উৎসব বেশি ঘটা করে  হয়,   
 কিন্তু  উগ্রপন্থী বাঙালি মুসলমানরা  বাংলাদেশ থেকে বাঙালি সংস্কৃতি প্রায় ধ্বংস  করে দিয়ে আরবীয় সংস্কৃতি আমদানি করছে বলে  ভবিষ্যতে  আদৌ এই   ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি উৎসবটি বাংলাদেশে  পালন করা সম্ভব হবে কি না আমার সন্দেহ। এমনিতে বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখের তারিখ বদলে দিয়েছে এরশাদ সরকার। ১৪ই এপ্রিল তারিখটিতে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ পালন করার সরকারি আদেশ জারি   হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের   বাঙালি হিন্দুরা যা পালন করছে, তা থেকে যেন একটু বদল হলেই মুসলমানিত্বটা ভালো বজায় থাকে। কী আর বলবো, মূর্খতার কোনও কুল কিনারা নেই! পাকিস্তানি শাসকরা চাইতো বাঙালি হিন্দু আর
বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিতে বিভেদ বাড়ুক। ওরা বিভেদ না বাড়াতে পারলেও বাংলাদেশে ওদের যে অনুসারীদের ওরা রেখে গেছে, তারাই বিভেদ বাড়াচ্ছে এখন। তারাই  বাংলা  ক্যালেণ্ডারকে মুসলমানের ক্যালেণ্ডার বানিয়েছে। বাংলা ক্যালেণ্ডারের পেছনে মোগল সম্রাট আকবরের অবদান ছিল বলে আকবরের ধর্মের কিন্তু কোনও অবদান ছিল না। কেবল কৃষিকাজের, কেবল ফসলের, কেবল  খাজনা আদায়ের    হিসেব রাখতে হিজরি ক্যালেণ্ডারের বদলে বাংলা ক্যালেণ্ডার সুবিধে বলেই ওই ক্যালেণ্ডারের সূচনা  করা হয়েছিল।

আমার নানি চৈত্র সংক্রান্তিতে তেতো রাঁধতেন।  নানি রাঁধতেন, কারণ নানির মা রাঁধতেন। নানির মা রাঁধতেন, কারণ নানির মা’র মা রাঁধতেন। নানির মা’র মা রাঁধতেন, কারণ নানির মা’র মা’র মা রাঁধতেন। চৈত্র সংক্রান্তিতে আমার খালারা বা মামিরা কিন্তু এখন আর  তেতো খাবার রাঁধেন না, তেতো খাবার খানও  না। চৈত্র সংক্রান্তিতে    গ্রামে গ্রামে    চড়ক পুজো হত। আমার দাদারা বাঁশবন পার হয়ে চড়ক পুজো দেখতে যেতো।  ওখানে বাঁশ - দড়ির খেলা দেখতো হাঁ করে।  ওই দিনই  লোকনাথ পঞ্জিকা কিনতো সবাই। আমার দাদারাও।   বৈশাখের প্রথম দিনে   নানারকম   মাটির কাজ, বেতের কাজ, কাঠের কাজ, শোলার কাজের  মেলা বসতো।   পশ্চিমবঙ্গে একই দিনে বৈশাখের উৎসব হত। বাংলাদেশে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খিস্টান সব বাঙালিই বৈশাখের উৎসবে অংশ নিত। নানারকম খেলা প্রতিযোগিতা হত গ্রামে,  নৌকা বাইচ, কুস্তি, লাঠি খেলা, এসব।   
আমাদের মফস্বল শহরে আমরা ছোটরা  সকাল থেকে বাজাতাম বাঁশি-বেলুন। বিকেলে বিন্নি ধানের খই,  চিনির হাতি ঘোড়া, মাটির পুতুলের মেলায় যেতাম।   

সেই সবও কি আর আছে আগের মতো!  এখন শুনেছি যা হওয়ার শহরেই হয়, যারা বাঙালি সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, সেই শিল্পী সাহিত্যকদের দলটিই    ভোরবেলা গান গায়   রমনার অশ্বথ্ব তলায়।  সারা দিন গাইতে থাকে    জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক, যাক ভেসে যাক, যাক ভেসে যাক। রমনায় সংস্কৃতমনা, মুক্তমনা   বাঙালির ভিড় বাড়ে বৈশাখের ভোর থেকেই।  পান্তাভাত, কাঁচা লংকা, ইলিশ মাছ খাওয়ার ধুম পড়ে।
সুতি শাড়ি আর পাজামা পাঞ্জাবিতে ছেয়ে যায় রমনা।    ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট নামের  বিখ্যাত এক গানের দল    বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করছে রমনায়। পাকিস্তানি শাসকের অত্যাচার সয়েছে। তার চেয়েও বেশী অত্যাচার সইছে স্বাধীন বাংলাদেশে। মুসলমান মৌলবাদিরা গ্রেনেড ছুঁড়েছে পয়লা বৈশাখে, ছায়নাটের গানের অনুষ্ঠানে। তারা পছন্দ করে না ইসলামি সংস্কৃতির বাইরে অন্য কোনও সংস্কৃতি। বিশেষ করে বাংলা সংস্কৃতি।    


পয়লা  বৈশাখে      ছায়ানট ছাড়াও উল্লেখযোগ্য উৎসব  ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে   সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘোরে।     রং-বেরঙের মুখোশ, বিশাল বিশাল  কাগজের বাঘ ভালুক হাতি ঘোড়া থাকে শিল্পীদের হাতে হাতে।   
ঢাক ঢোলক  বাজে। আটপৌড়ে শাড়ি, ধুতি পরে ছেলে মেয়েরা নাচে।  রাস্তা আগের রাতেই মুড়ে দেওয়া হয়  চমৎকার আল্পনায়। এই  বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা দেখার জন্য   আজও ভীষণ ভিড়।  কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই নিরাপদ জায়গাটুকুতেই।



শুনেছি সোনারগাঁয়ে  নাকি বউমেলা   হয়। সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজো করতেই মূলত লোক আসে। 
মনের গোপন বাসনা পুরণের  আশায় নাকি মেয়েরাই বেশি আসে। পাঁঠাবলির রেওয়াজও নাকি আছে।   সোনারগাঁর কাছেই  আরেক অঞ্চলে  ঘোড়ামেলাও হয়। কোনও এক সময় কোনও এক লোক  নাকি    ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের দিনটিতে সবাইকে প্রসাদ খাওয়াতেন।  লোকটি  মারা যাওয়ার পর   তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়েছে গাঁয়ের লোক।  প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে ওই স্মৃতিস্তম্ভে    একটি   মাটির ঘোড়া রাখা হয়।  আর  ওটির আশেপাশেই  রীতিমত হৈ হৈ করে  মেলা বসে যায়।  এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ যারাই মেলায় আসে, সবাইকে  কলাপাতায়  খিচুড়ি  খাওয়ানো। এক দিনের এ মেলায় হাজারো লোকের সমাগম ঘটে। এই ঘোড়ামেলায় শুনেছি   নাগরদোলা, পুতুল নাচ আর  সার্কাসও থাকে।    কীর্তন হয় মধ্যরাত পর্যন্ত।  এখন জানি না কীর্তন আগের মতো হয় কি না বা  এখনও  আদৌ ওই ঘোড়ামেলাটাই হয় কি না। আর হলেও জানিনা ঠিক  কতদিন হতে পারবে এসব মেলা। 

বাংলাদেশে দু যুগের বেশি হল বাঙালি সংস্কৃতিকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে আরবীয় সংস্কৃতি
আনার যে কাজ  জীবন –মরণ  পণ করে চালাচ্ছে ধর্মান্ধ মূর্খরা,   তাতে তারা  অবিশ্বাস্য রকম সার্থক। একশয় একশ না পেলেও ষাট সত্তরের কাছাকাছি নম্বর জুটে যাচ্ছে।  ধর্মের রীতি টুকু বাদ দিলে, সব ধর্মের  বাঙালির আচার অনুষ্ঠান একই ছিল এতকাল। এখন শুনি বাঙালি মুসলমানরা নাকি ‘গায়ে হলুদ’ অনু্ষ্ঠানটিকে আর ‘গায়ে হলুদ’ বলে না। বলে, মেহেদি।   
মুসলমানি মেহেদি! হলুদ শাড়ির বদলে মেয়েরা  মেহেদি রঙের শাড়ি পরে গায়ে হলুদের দিনে। চিরকালের লাল বেনারসির বদলে   শাদা গাউন পরে শুনেছি বিয়ে  করছে কেউ কেউ। একটা অসাধারণ সংস্কৃতিকে, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে, নিজ পরিচয়কে   খৎনা করে দেওয়া হচ্ছে চোখের সামনে। আর খৎনা করার  হাজমগুলো, হাতে ছুরি নিয়ে   তাণ্ডব নৃত্য করছে। মুখ বুজে হাজমদের নাচ দেখছে সবাই। দেশ হাজমে গিজহিজ করছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে হয়তো দেখেইনি  হালখাতা, গ্রামে গ্রামে পয়লা বৈশাখের মুড়ি মুড়কির, পিঠেপুলির  মেলা।



আমি বাংলাদেশের হাজমের নাচ বন্ধ করতে পারবো না। ও দেশ থেকে আজ কুড়ি বছর হল আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পয়লা বৈশাখের উৎসব আরও বর্ণাঢ্য করতেও আমি পারবো না।
ও রাজ্য থেকেও আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। দু’ অঞ্চলেই মূর্খদের সংখ্যা প্রচুর। ওই মূর্খদের খুশি করতেই নাকি আমার উপস্থিতি বাংলায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূর্খরাই মূর্খদের খুশি রাখে। আমি আজ শুধু একটি আবেদনই করছি--   দুই বাংলায় দুটো ভিন্ন দিনে নয়, একই দিনে, একই তারিখে, পয়লা বৈশাখটা অন্তত করা হোক। বাঙলা ক্যালেণ্ডারের পয়লা বৈশাখ গ্রেগরীয় ক্যালেণ্ডারে কখনও তেরো, কখনও চৌদ্দ, কখনও পনেরো।  কিন্তু বাংলাদেশে চৌদ্দ তারিখকে পয়লা বৈশাখের জন্য শেকল দিয়ে  বেঁধে দেওয়া হয়েছে।      
ঈদ রোজাগুলোর তারিখ কিন্তু বাঁধা হয়নি।  হিজরি ক্যালেণ্ডার  অনুযায়ীই সেসব পালন করা হয়। তবে বুড়ো হাজম ডেকে বাংলা ক্যালেণ্ডারের  মুসলমানি করাটার দরকার কী ছিল! হিন্দু থেকে পৃথক হওয়ার জন্য ভিনদেশি  সংস্কৃতি আনা,   বাঙালি সংস্কৃতি বিলুপ্ত  করা, আরব না হয়েও জোর করে আরব হওয়ার চেষ্টা –এসবই  কি সত্যিকারের মুসলমান হওয়ার রাস্তা! নিজেদের  ঐতিহ্যের সবটুকু বিসর্জন দিয়ে অন্য অঞ্চলের সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি বলে বরণ করায়  কোনও গৌরব নেই।    ওই আরব দেশে বসে কোনও এক কালে কোনও এক লোক ধর্ম রচনা করেছিল, যে ধর্মের তুমি অনুসারি  কারণ ওই অঞ্চলের কিছু লোক তোমার অঞ্চলে   তাদের ধর্মকথা শোনাতে ঢুকেছিল, হয় তোমার পূর্বপুরুষ বা পূর্বনারী ওদের কথায় ও কাজে  মুগ্ধ হয়ে ভিনদেশি মরুভূমির ধর্ম বরণ করেছে,   নয় নিচু জাত বলে বা গরিব বলে তাদের নিজেদের ধর্মের কতিপয় দুষ্ট  লোক  দ্বারা উপেক্ষিত আর শোষিত   হতে হতে ধর্মান্তরিত হয়েছে।  আরব দেশেও   কিন্তু ‘ভিক্ষুক, মিসকিন’ বলে তোমাকে ঘেন্না ছিটোচ্ছে আরবরা। এই সেদিনও আট জন বাঙালি মুসলমানকে  জনসমক্ষে জবাই করলো।   কারা জবাই করলো মুসলমানদের? মুসলমানরা। যা তোমার বাপ দাদার সংস্কৃতি নয়, তাকেই তোমার বাপ দাদার সংস্কৃতি হিসেবে লুফে নিচ্ছ আজ। এমন নয় যে ভালোবেসে নিচ্ছ, ভয়ে নিচ্ছ, বিভ্রান্তিতে নিচ্ছ। আর পরিণত হচ্ছ নামহীন, ঠিকানাহীন, পরিচয়হীন একটা  ধর্মের পিণ্ডে।  ময়ুরপুচ্ছে কাকের লেজ লাগাচ্ছো মুসলমান হওয়ার জন্য। না, এই অসততা করে  তুখোড়  মুসলমান হয়তো  হওয়া যায়, ভালো মানুষ  হওয়া যায় না। 





দুই বাংলায় পয়লা বৈশাখের তারিখটা এক হলে অন্তত মনে হবে,   উৎসবটা  বাঙালির উৎসব।  দুই দেশের বাঙলা একাডেমীর কর্তারা   অন্তত পয়লা বৈশাখের উৎসবটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কথা বলুন।  অন্তত একদিনের জন্য হলেও না হন হিন্দু, না হন মুসলমান। অন্তত একদিনের জন্য একবার একটু বাঙালি হন। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি এবং হাসিনা সরকার, শুনছেন? ক্যালেণ্ডারের কোনও ধর্ম নেই,  লিঙ্গ নেই। ধর্মহীন, লিঙ্গহীন ক্যালেণ্ডারকে কুপিয়ে মুসলমান বানিয়েছেন মনে করছেন, আসলে ও মুসলমান হয়নি। ও এখনও আগের সেই ধর্মহীন লিঙ্গহীন  বাংলা  ক্যালেণ্ডারই রয়ে গেছে। ক্যালেণ্ডারকে মানুন। আল্লাহ জানেন যে আপনারা বাঙালি, এ কোনও লজ্জার কথা নয়। আরবরাও জানে আপনারা বাঙালি, নকল আরব সাজার চেয়ে ভালো বাঙালি হন, এতে আরবদের  শ্রদ্ধা পাবেন। তা না হলে যে মিসকিন, সে চালচুলোহীন নাম পরিচয়হীন মিসকিনই জীবনভর রয়ে যাবেন।