Sunday, 15 June 2014

সন্ত্রাস







দশজন ইসলামী সন্ত্রাসী সহ  মোট আঠাশ জন লোকের মৃত্যু হল করাচী বিমানবন্দরে। দশজন সন্ত্রাসীর শরীরে আত্মঘাতী বোমা   ছিল। সঙ্গে খেঁজুর, গুড়, মটর, বাদাম ছিল, গ্রেনেডও ছিল, পেট্রোল বোমাও ছিলবিমান বন্দর বেশ কিছুদিন দখলে রেখে সন্ত্রাস চালানোর ইচ্ছে টিচ্ছে ছিল বোধহয়। বিপদ দেখলে পেটে বাঁধা আত্মঘাতি বোমার বোতাম টিপবে, মুহূর্তে ভস্ম হয়ে যাবে। কিন্তু খেঁজুর খাওয়ার সময় ওরা আর পায় নি। তার আগেই জীবন দিতে হলো।

তেহেরিক-ই-তালিবান সগৌরবে ঘোষণা করেছে, যে, তারাই বিমান বন্দরে   আক্রমণ  করেছে।   দলের আমির হেকিমুল্লাহ মাসুদকে     আমেরিকা দ্রোন হামলায় মেরেছে, তার প্রতিবাদে, আর   ওয়াজিরিস্তানে কোনও রকম  পুলিশি হামলা  যেন না চলে –এই হুমকি দিতেই  সন্ত্রাস চালিয়েছে, নিজেরা মরেছে মরেছে,  কিন্তু কিছু লোককে তো নিয়ে মরেছে। গোটা দুনিয়া জানলো তেহেরিক কী চায়। এই আক্রমণে  আঠাশ জনের প্রাণ চলে গেলো, এতে অবশ্য তালিবানদের কারও কোনও অনুশোচনা নেই।    জীবনের চেয়ে  ধর্ম ওদের কাছে অনেক বড় ধর্মান্ধদের কাছে  মানুষের জীবনের, লৌকিকের  গুরুত্ব নেই,  গুরুত্ব আছে  মৃত্যুর আর অলৌকিকের, আর গুরুত্ব আছে ঈশ্বরের। আকাশে বসে আছে যে ঈশ্বর, সেই ঈশ্বরের।  যে ঈশ্বরকে এখনও কেউ দেখেনি, যার  অস্তিত্ব নিয়ে    বিস্তর তর্ক বিতর্ক চলে, গুরুত্ব সেই ঈশ্বরের।   

আমি ঠিক বুঝি না, যে জীবনটাকে  মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, সেই জীবনটাকে কী কারণে   এত সহজে ছাই করে দিতে পারে! ধর্ম তো জগতে আরও আছে, প্রলোভন তো আরও ধর্মেরও আছে, অন্যায় অবিচার অত্যাচারের উপদেশ তো আরও ধর্মও দিয়েছে, কিন্তু ইসলামে বিশ্বাসীরাই কেন সারা পৃথিবীতে  সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে। এর কারণ কি নিতান্তই নিবুর্দ্ধিতা, অজ্ঞতা, অশিক্ষা নয়? কিন্তু অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যেও তো নির্বুদ্ধিতা, অজ্ঞতা, অশিক্ষা  আছে। তবে কেন  একটি ধর্মগোষ্ঠিই আজও তাণ্ডব করে চলেছে, মানুষ হত্যা করে চলেছে!  অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠী কখনও যে সন্ত্রাস করেনি, তা নয়, প্রচুর করেছে। কয়েক শতক ধরে ক্রিশ্চান ইনকুইজেশনের যে হত্যালীলা চলেছে, তা   কে ভুলবে! তবে  সন্ত্রাস এখন অনেকটাই বন্ধ করেছে  তারা।   আত্মঘাতী বোমা বনার মতো ভয়ংকর আবেগ  অন্তত   অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠির মধ্যে নেই।   

আজ গোটা বিশ্বে ইসলামী সন্ত্রাস সবচেয়ে বেশি যাদের ভোগাচ্ছে, তারা মুসলমান। ইসলামী সন্ত্রাসীদের কারণে সবচেয়ে  বেশি যারা মরছে, তারা মুসলমান। আর এদের সন্ত্রাসের  বিরুদ্ধে সবচেয়ে কম যারা প্রতিবাদ করছে, তারাও কিন্তু ওই মুসলমানইএর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী হতে পারে!    

পাকিস্তানকে নিয়ে আমার যে ভয়, সেটা হলো কবে না আবার কোন  সন্ত্রাসী  পারমানবিক বোমার   নাগাল  পেয়ে যায়। নিরাপত্তা রক্ষীর ছদ্মবেশে সন্ত্রাসীরা যদি বিমান বন্দরে একবার ঢুকতে পারে, নিরাপত্তা রক্ষীর ছদ্মবেশে ওরা কেন পারমানবিক বোমা রাখার ঘরে ঢুকতে পারবে না! পারমানবিক বিজ্ঞানীর ছদ্মবেশও ওরা নিতে পারে। ওদের মতো ঘৃণায় টগবগ করা বীভৎস প্রাণীগুলো কবে যে টিপে বসে   পারমানবিক মারণাস্ত্রের ট্রিগার। কবে যে পৃথিবীর সবকিছুকে নিমেষে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে ফেলে!

উত্তর কোরিয়ায় একটা পাগল স্বৈরাচারী বসে আছে। পাকিস্তানের ক্ষমতাবানদের মধ্যে থিকথিক করছে  ইসলামী মৌলবাদী আর সন্ত্রাসী।   ওই দুই দেশেই রয়েছে পারমানবিক বোমা। এ খবর অনেকেই জানে যে পাকিস্তানের দুই পরমাণু বিজ্ঞানী, যাঁরা পাকিস্তানের  পারমাণবিক বোমা বানিয়েছেন,   তালিবানদের খুব ঘনিষ্ঠ লোক। তাঁরা তালিবান আমলে আফগানিস্তানে    ঘন ঘন গেছেন, ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গেও দেখা  করেছেন   আল কায়দাকে পারমানবিক, রাসায়নিক আর বায়োলজিক্যাল অস্ত্র বানিয়ে দেওয়ার চুক্তিও  করে ফেলেছিলেন।    মনে আছে পারমানবিক বিজ্ঞানী সুলতান বশির উদ্দিন মাহমুদ আর চৌধুরী আবদুর মাজেদের কথা? ওঁরা   ‘উম্মাহ তামির-এ-নাউ’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেছিলেন,  বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের পারমানবিক বোমা শুধু পাকিস্তানের নয়, এ বোমা পৃথিবীর সমস্ত মুসলিম উম্মাহর’। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে     বশির উদ্দিন মাহমুদ এত বেশি জড়িয়ে ছিলেন   যে,  পাকিস্তানকে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে আমেরিকা, যেন   বশির উদ্দিন মাহমুদকে  ‘পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশন’ থেকে সরিয়ে দেয়।     মাহমুদ  এখন কোরান এবং বিজ্ঞানের মধ্য মিল বের করছেন ঘরে বসে, আর একের পর এক এই বিষয়ে বই লিখে যাচ্ছেন।  বিজ্ঞান শিখলে ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কার থেকে মুক্ত হওয়া যায়, এ কথা আমরা বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তচিন্তকরা সেই কতকাল থেকে বলছি। যখন দেখি উঁচু মাপের বিজ্ঞানীরাই ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কারের কাদায় ডুবে আছে, তখন ব হতাশ হই।  অবশ্য সব বিজ্ঞানী তো নয়, যত বিজ্ঞানী আছে জগত জুড়ে, তার বেশির ভাগই ধর্মমুক্ত।  সব গোষ্ঠিতেই তো ব্যতিক্রম আছে। বিজ্ঞানীদের মধ্যেও আছে।  

সারা পৃথিবীর মানুষ ধিক্কার দিচ্ছে ইসলামী সন্ত্রাসীদের। অনেক সময় দেখা যায়, দোষটা সন্ত্রাসীদের ওপর থেকে সরে গিয়ে পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ছে। নিরীহ  মুসলমানরাও, যারা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়, তাদেরও মানুষ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে,  ঘৃণার চোখে দেখছে। মুসলিম সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাস দেখতে দেখতে মানুষ এখন ক্লান্ত। কদিন পর পরই   সন্ত্রাসের খবর আসে, মানুষের মৃত্যুর খবর আসে, ভয়ে মানুষ তটস্থ, মানুষের ক্রোধও ক্রমশ বাছে। মুসলিম সন্ত্রাসীদের পক্ষে কথা বলার লোকের এদিকে অভাব নেই। বিশেষ করে বামপন্থীদের বেশির ভাগই সন্ত্রাসীদের পক্ষে সওয়াল করেনতাঁদের বক্তব্য,  ‘পাশ্চাত্যের দেশগুলো মুসলমান বিরোধী, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, নির্বাচারে মুসলমান   মারছে, ইজরাইলের অত্যাচারেও মুসলমানরা অতিষ্ঠ। সুতরাং মুসলমানদের অধিকার আছে তাদের যা খুশি করার, শরিয়া আইন বলবৎ করার, নিজেদের ইসলামী ঐতিহ্য, সংস্কার, ইত্যাদি টিকিয়ে রাখার, প্রয়োজনে  সন্ত্রাসী হওয়ার, প্রয়োজনে জোর জবরদস্তি করে মেয়েদের বোরখা পরাবার, মেয়েদের পাথর ছুড়ে মারার।’ নিজেদের বেলায় কড়ায় গল্ডায় আধুনিকতা চাই, আর মুসলমানদের বেলায় এক টুকরো মধ্যযুগ হলেই চলবে।   বামপন্থীদের শঠতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই।
মুসলিম দেশগুলোতে তো বটেই, মুসলিম মৌলবাদীরা এখন ইউরোপেও অশান্তি করছে।    সেখানেও যত্রতত্র ইসলামের পতাকা পুঁতে দিচ্ছে। রাতে রাতে লণ্ডনের মুসলিম এলাকায়   মৌলবাদীরা টহল দিচ্ছে। পথচারীদের আক্রমণ করছে, হুমকি দিচ্ছে।  মেয়েদের পোশাক পছন্দ না হলে রীতিমত পথ আটকে অপমান করছে, বলে দিচ্ছে, এ পোশাক পরে মুসলমান এলাকায় হাঁটা চলবে না।  মদের বোতল নিয়ে বা মদ খেয়ে এই রাস্তায় হাঁটা চলবে না, শাসাচ্ছে পথচারীদের।  সমকামীদের এই এলাকার ঢোকা  চলবে না, কারণ এ এলাকা মুসলিম এলাকা। লন্ডনের রাস্তা দখল করে নিতে চাইছে মুসলিম মৌলবাদীরা। তারা ঠিক করে দিতে চাইছে, মানুষ কী পোশাক পরবে, কী খাবে বা পান করবে, কোন রাস্তায় হাঁটবে,  কার সঙ্গে শোবে না শোবে। মুসলিম এলাকা যেন মুসলমানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। পৃথিবীর মানুষ এইসব  ভিডিও দেখছে ইউটিউবে। ছিঃ ছিঃ করছে। আর ওদের  ঘৃণাটা রাগটা গিয়ে পড়ছে পাশের বাড়ির নিরীহ মুসলমানের ওপর অথবা মুসলমান দোকানীর ওপর বা অফিসের  মুসলমান কর্মচারীর ওপর। 
শুধু রাস্তা দখল নয়, কিছুদিন আগে ধরা পড়েছে মুসলিম মৌলবাদীদের ট্রজান হর্স ষড়যণ্ত্র, বার্মিংহামের ইস্কুলগুলো দখল করে  নেওয়ার ষড়যন্ত্র। সেকুলার ইস্কুলগুলোকে  মাদ্রাসা বানিয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্র ধরা পড়ার পর  লোকে নিন্দা  করছে মৌলবাদীদের। আবারও    রাগ   গিয়ে পড়ছে  মুসলিম গোষ্ঠীটার ওপর, নিরীহ মুসলমানও  শিকার হচ্ছে লোকের ঘৃণার, লোকের ক্রোধের। এগারোই সেপ্টেম্বরে  মুসলিম সন্ত্রাসীদের আমেরিকা হামলার পর কিছু  লোক এতই মুসলমানবিদ্বেষী হয়ে উঠেছিল যে   কিছু শিখকে মুসলমান ভেবে গুলি করে মেরেছে।
মুসলিম মৌলবাদী আর  সন্ত্রাসীরা   গোটা মুসলিম সম্প্রদায়ের  যত ক্ষতি করছে, তত ক্ষতি আর কেউ করছে না। একসময় ইসলামকে যারা শান্তির ধর্ম বলে মনে করতো, তারা এখন আর মনে করছে না এটি শান্তির ধর্ম। প্রচুর মুসলমানও  দিন দিন নাস্তিক হচ্ছে।  সংখ্যাটা বাড়ছে। বেশ কয়েকদিন ফেসবুকের কিছু পোস্ট পড়লাম, যে কথা আমি সেই আশির দশকে বলে মৌলবাদীদের রোষানলে পড়েছিলাম, দেশান্তরী হতে হলো যে কারণে, সেইসব সাহসী কথা সগৌরবে বলছে আজকের অনেক তরুণ। আমার চেয়েও আরও জোরে সোরে  বলছে। সব দোষ কিন্তু  মৌলবাদীদের। কারণ তারাই ইসলামের সুনাম নষ্ট করছে।  মৌলবাদীরা যদি তাদের ঘৃণ্য কীর্তিকলাপ বন্ধ  না করে, তাহলে  নিশ্চিতই  নাস্তিকের সংখ্যা আরও বাড়বে, সাধারণ মুসলমানরা উঠতে বসতে লোকের কাছে আরও অপদস্থ হবে।   

Tuesday, 24 December 2013

ফাঁসিতে বিশ্বাসি দেশগুলো কাদের মোল্লার ফাঁসির সমালোচনা করছে কেন?




আমি ফাঁসি বিরোধী মানুষ। আমি মনে করি, প্রতিটি মানুষের বাঁচার অধিকার আছে। প্রতিটি যুদ্ধাপরাধীর বিচার হওয়া উচিত। ফাঁসির বদলে   অন্য যে কোনও শাস্তি তারা পেতে পারে। যাবজ্জীবন? নয় কেন? অবশ্য আজকাল আমি যাবজ্জীবনেও  আপত্তি করি। জেলখানা ব্যাপারটাকেই আমি পছন্দ করি না। জেলখানাগুলো হতে পারে  সংশোধনী কেন্দ্র। যতদিন মাথার      কুচুটে কীটগুলো মরে যাচ্ছে, বা মাথা থেকে  বেরিয়ে যাচ্ছে,  ততদিন অপরাধীরা থাকবে ওই কেন্দ্রে। কে যেন একজন বলেছিলেন, ‘জেলখানার ঘরগুলো হতে পারে এক একটা ক্লাসরুম, আর  জেলখানাগুলো   এক একটা বিশ্ববিদ্যালয়’কিছুদিন আগে সুইডেনের কিছু জেলখানা বন্ধ করে দিতে হয়েছে, কারণ জেলে মোটে লোক নেই। অপরাধের সংখ্যা কম, তাই আসামীর সংখ্যাও  কম। সমাজটাকে বৈষম্যহীন যত করা যায়, যত সমতা আনা যায় মানুষে-মানুষে, অপরাধ তত কমে যায়। সে সুইডেনের ব্যাপার, বাংলাদেশ তো আর সভ্য হয়নি, জেলখানা বন্ধ করে দেওয়ার স্বপ্ন না হয় আপাতত থাকুক। অন্য কথা বলি।


বিশ্বের   মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বলছে, বলুক। তারা সারা পৃথিবীর যে দেশেই মৃত্যুদণ্ডের আইন আছে,   সেই দেশকেই বলছে, ‘মৃত্যুদণ্ডের আইন বাতিল করো’কিন্তু আমার প্রশ্ন, যে দেশগুলো  মৃত্যুদণ্ডের আইন বহাল রেখেছে, নিজেরাও  মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে ঘনঘন, সেই দেশগুলো বাংলাদেশের মৃত্যুদণ্ড নিয়ে অত অশ্রু বিসর্জন করছে কেন? তারা কি অন্য কোনও দেশে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে এমন হামলে পড়ে, এমন মড়াকান্না কাঁদে? তারা কি চীনের বা সৌদি আরবের বা ইরানের বা আমেরিকার বা উত্তর কোরিয়ার চৌকাঠে নাছোড়বান্দার মতো এমন বসে থাকে? বাংলাদেশে অন্য কারও ফাঁসি হলে তো এদের চেহারা দেখা যায় না। তবে কি    কাদের মোল্লার ফাঁসি বলেই এত হাহাকার? কাদের মোল্লা   মৌলবাদী বলে? আর যাকেই মারো, ইসলামী মৌলবাদীর গায়ে আঁচড় কাটতে পারবে না! কাদের মোল্লা যুদ্ধাপরাধী এ কথা কেউ বলছো না কেন!  আজও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের খুনীদের বিচারে নানা দেশের শোক দেখে স্তম্ভিত হই। মৌলবাদী অপশক্তির বন্ধুর সংখ্যা কম নয় আজ সারা বিশ্বে। যে পশ্চিমী দেশগুলোকে ইসলামের শত্রু বলে ভাবা হতো, তারাও দেখা যায় ইসলামী মৌলবাদীদের প্রতি অস্বাভাবিকরকম সহানুভূতিশীল। আমার আর ইচ্ছে করে না ভাবতে কী কী রাজনীতি আছে  মৌলবাদসমর্থনের পেছনে। একাত্তরের যুদ্ধকে মৌলবাদসমর্থক পশ্চিমী গোষ্ঠী যুদ্ধই মনে করতে চায় না। যেন গরিব দেশের যুদ্ধ কোনও যুদ্ধ নয়, তিরিশ লক্ষ মানুষের মরে যাওয়া কোনও মরে যাওয়া নয়, দু’লক্ষ মেয়ের ধর্ষণ কোনও ধর্ষণ নয়। যেন আমাদের দুর্ভিক্ষ, আমাদের ক্ষুধা, আমাদের অভাব, অশিক্ষাই সত্য, আর কিছু সত্য নয়। যেন আমাদের ভাষা, আমাদের গান, ভালোবাসা, আমাদের ব্যক্তিত্ব, আমাদের সংগ্রাম, আমাদের সাহস, আমাদের আশা আকাংখা, স্বপ্ন কিছুই সত্য নয়, মূল্যবান নয়।

 

আমি মৃত্যুদণ্ডে কেন বিশ্বাস করি না, তা বলছি।  কোনও প্রাণীই বা কোনও মানুষই  অপরাধী বা সন্ত্রাসী হয়ে জন্ম নেয় না। একটি শিশুকে যদি সুস্থ সুন্দর শিক্ষিত পরিবেশ দেওয়া না হয়, একটি শিশুর গড়ে ওঠার সময় যদি তার মস্তিস্কে ক্রমাগত আবর্জনা ঢালা হতে থাকে, তবে এই শিশুরাইড় হয়ে  অপরাধে  আর  সন্ত্রাসে নিজেদের জড়ায়। এ কি  ওদের  দোষ?  নাকি   যারা আবর্জনা ঢালে, আবর্জনা ঢালার যে প্রথা যারা চালু রাখছে সমাজে, তাদের দোষ!  একই সমাজে বাস করে আমি মৌলবাদ বিরোধী,  কাদের মোল্লা বা দেলওয়ার হোসেন সাইদি মৌলবাদী, কেউ   খুনী, ধর্ষক, চোর, আবার কেউ সৎ, সজ্জন। সমাজ এক হলেও শিক্ষা  ভিন্ন বলেই এমন হয়। একদল লোক বিজ্ঞান শিক্ষা পাচ্ছে, মানবাধিকার সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করছে, আলোকিত হচ্ছে। আরেক দলকে  ধর্মান্ধ, মূর্খ,  কূপমণ্ডুক আর বর্বর বানানো হচ্ছে, ফেলে রাখা হচ্ছে ঘোর অন্ধকারে। শিক্ষার ব্যবস্থাটা  সবার জন্য সমান হলে, শিক্ষাটা সুস্থ শিক্ষা  হলে, সমানাধিকারের শিক্ষা হলে, মানুষেরা মন্দ না হয়ে ভালো হতো। ছোটখাটো অভদ্রতা, অসভ্যতা, টুকিটাকি অপরাধ থাকলেও সমাজ এমনভাবে নষ্টদের দখলে চলে যেতো না, এত লক্ষ লক্ষ লোক খুনের পিপাসা নিয়ে রাজপথে তাণ্ডব করতো না। কাদের মোল্লার জন্য বিদেশের কয়েকজন কাঁদলেই আঁতকে উঠি, কিন্তু দেশের লোকেরা যে উন্মাদ হয়ে উঠেছে কাদের-প্রেমে? এরাই তো এক একজন কাদের মোল্লা। এক কাদের মোল্লাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু হাজার হাজার কাদের মোল্লা যে বিজ্ঞানমনস্ক মৌলবাদ-বিরোধী মানুষদের গলা কাটছে, তাদের কী করা হবে?  গুটিকয় মৃত্যুপথযাত্রী অথর্ব  যুদ্ধপরাধীর চেয়েও লক্ষ লক্ষ ইসলামী মৌলবাদী নিসঃন্দেহে ভয়ংকর। তারা আজ যুদ্ধপরাধী কাদের মোল্লার স্বপ্ন বাস্তবায়নের   এক একজন   সৈনিক।   

 

 

যে দেশে সবার জন্য খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা স্বাস্থ্য নেই, সেই দেশে অরাজকতা থাকেই।  অন্য সব ব্যবস্থার মতোই  বিচার ব্যবস্থাতেও আছে গলদসে কারণেই অপরাধ করলে কী কারণে অপরাধ করেছে, কোথায় ভুল ছিল এসব না ভেবে,  ভুলগুলো শোধরানোর চেষ্টা না করে অপরাধীকে জেলে ভরা হয়,   মেরে ফেলা হয়। ফাঁসি দিয়ে অনেক সমস্যার চলজলদি সমাধান  করতে চায় সরকার।  কিন্তু একে সমস্যার সত্যিকারের সমাধান  হয় না।    আমি ভবিষ্যতের কথা ভাবি, মৌলবাদী অপশক্তির অবসান চাই। অবসান ফাঁসি দিয়ে হয় না, এই অবসান সুশিক্ষা দিয়ে করতে হয়।

 

সমাজকে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, নারীবিদ্বেষ থেকে মুক্ত করতে হলে মানুষকে শিশুকাল থেকেই   শিক্ষা দিতে হবে বিজ্ঞান,   মানববাদ, সমানাধিকার।   এই শিক্ষা পেলে শিশুদের ধর্মান্ধ, ধর্ষক আর খুনী  হওয়ার  আশংকা থাকে না।

 

জামাতে ইসলামির লোকেরা  যে ভয়ংকর বর্বরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশে, তা দেখে আমি অবাক হইনি। কারণ আমি অনেক বছর থেকেই জানি যে জামাতে ইসলামি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত হলেও এটি একটি সন্ত্রাসী দল ছাড়া কিছু নয়। এদের রাজনীতি ঘৃণার, বৈষম্যের, অন্ধত্বের, অকল্যাণের, পঙ্গুত্বের, হত্যার। এই রাজনীতিকে সমাজে প্রবেশের  করার সুযোগ দিলে এই রাজনীতি মানুষকে, দেশকে, দেশের ভবিষ্যতকে ধ্বংস করে দেবে। খুব সংগত কারণেই জামাতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা উচিতপৃথিবীর সব দেশেই সন্ত্রাসী দল নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে গেলে ‘গেল রে গেল রে’ বলে  ছুটে এসে বাধা দেয় অনেকেইযে দল গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, সেই দলকে গণতন্ত্রের নামে বাঁচিয়ে রাখবো আর  হাসতে হাসতে সে আপনার রগ কাটবে, আমার   গলা কাটবে—এ আমরা জানি। জেনেও না জানার ভান আর কেউ করলেও আমি করি না।  বাংলাদেশকে একটা ধর্মীয় মৌলবাদীতে ঠাসা, অনুন্নত, অশিক্ষিত, ধর্মান্ধ দেশ হিসেবে তৈরী করার বাসনা দেশের এবং দেশের বাইরের অনেকেরই যথেষ্ট।  আমি মত প্রকাশের স্বাধীনতায় প্রচণ্ড বিশ্বাসী হয়েও একটি দলকে নিষিদ্ধ করতে চাইছি, কারণ জামাতে ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য নয়।

 

যুদ্ধপরাধীরা প্রায় সবাই ইসলামী মৌলবাদী। মৌলবাদী-যুদ্ধপরাধী বা ইসলামী মৌলবাদীদের খুব  ড় শত্রু আমি। তারা আমাকে খুন করার জন্য আজ একুশ বছর হলো ছুরিতে শান দিচ্ছে।  হাতের কাছে পেলেই আমাকে জবাই করবে।  এটা জেনেও আমি কিন্তু ওদের কারো ফাঁসি চাইছি না। ওরা ভালো মানুষ হোক, চাইছি। ওদের সন্তানেরা প্রগতির পক্ষের মানুষ হোক, চাইছি। ওদের সন্তানের সন্তানেরা  যেন না জানে ধর্মান্ধ মৌলবাদ কাকে বলে, যেন সবাই একটা শ্রেণীহীন,  বৈষম্যহীন, কুসংস্কারহীন সুন্দর পরিবেশ পায় বাস করার। সব মানুষ, এবং সব সন্তানই যেন পায়।   সেই স্বপ্নের জন্য লড়াই আমার। আমি ওই সমতার সমাজ বেঁচে থাকতে দেখতে পারবো না, কিন্তু  আমি সামান্য ভূমিকা রাখতে চাই সেই সুস্থ সমাজ গড়ায়, তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েও লিখছি, মানুষকে লড়াই করার প্রেরণা দিচ্ছিযে দেশকে আজ দেশ বলে মনে হয় না, যে দেশ নিয়ে আজ লজ্জা হয়, চাইছি, সেই দেশ নিয়ে  ভবিষ্যতের মানুষেরা গর্ব করুক। রক্তাক্ত রাজপথ নিয়ে    নয়, একটি নিরাপদ স্বদেশ নিয়ে গর্ব। 

 

 

 

Thursday, 7 November 2013

ধর্ষণের জন্য কে দায়ী?




কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের সিপিআইএম (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইণ্ডিয়া, মার্কসবাদ) বিধায়ক ও রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী রেজ্জাক মোল্লা  মেয়েদের সম্পর্কে কুৎসিত মন্তব্য   করেছেন, শুনে সত্যি বলতে কী, আমি অবাক হইনি। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের   চেয়ে   স্বভাবচরিত্রে  সিপিআইএম    খুব আলাদা নয়। সত্যিকার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়   নারীদের  সম্পূর্ণ সমানাধিকার নিশ্চিত। এ   সম্পর্কে  প্রচুর  সিপিআইএম নেতা-সমর্থকদের কোনও ধারণা নেই। রেজ্জাক মোল্লারও নেই বলে তিনি  অসমাজতান্ত্রিক, অশ্লীল, এবং অসত্য  একটি মন্তব্য করেছেন। এবং করেছেন  ‘জামাতে ইসলামি হিন্দ’এর জমায়েতে। আদর্শগত কারণে কোনও ধর্মীয় দলের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির    সম্পর্ক থাকার কোনও কথা নয়। কিন্তু ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সত্যিকার কমিউজমের আদর্শ থেকে লক্ষ যোজন দূরে। 

রেজ্জাক মোল্লা বলেছেন,  জিনস আর টপ পরে বেরোলে মেয়েদের  নিগ্রহ অনিবার্য,  ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির শিকার হলেও তাদের নালিশ করা উচিত নয়,  পোশাকই মেয়েদের বিপদ ডেকে আনে’। ----এই কথাগুলো রেজ্জাক মোল্লার একার কথা নয়, এগুলো প্রায় সব পুরুষের মনের কথা। অন্য পুরুষেরা  আজকাল এসব কথা মুখে না বললেও মনে মনে বলে। রেজ্জাক মোল্লার চোখ কান অত খোলা নেই বলে ফস করে বলে ফেলেছেন, জানেন না যে আজকাল  ধর্ষণের জন্য ধর্ষিতাকে দায়ী করাটা ‘পলিটক্যালি ইনকারেক্ট’।  বহু বছর ধরে    নারীবাদীরা পৃথিবীর সর্বত্র সবাইকে বোঝাচ্ছে, এমনকী প্রমাণও দেখাচ্ছে যে, ধর্ষণ   নারীর পোশাকের কারণে ঘটে না।  ধর্ষণের কারণ:  ১. বীভৎস কোনও কাণ্ড ঘটিয়ে পুরুষ তার  পৌরুষ প্রমাণ করে, ২. নারীকে নিতান্তই    যৌনবস্তু   মনে করে পুরুষ। সুতরাং যৌনবস্তুকে   ধর্ষণ করা অপরাধ নয় বলেই বিশ্বাস করে।  
নারীবাদীদের আন্দোলনের ফলে     ধর্ষণের জন্য   ধর্ষিতাদের দায়ী করাটা    সভ্য এবং শিক্ষিত লোকদের মধ্যে এখন অনেকটা  বন্ধ হয়েছে। কিন্তু যারা এখনও বন্ধ করছে না, তাদের নিশ্চিতই  চক্ষুলজ্জা বলতে যে জিনিসটা প্রায় সবার থাকে, নেই। পশ্চিমবঙ্গের অনেকে রেজ্জাক মোল্লার মন্তব্যের প্রতিবাদ করলেও বর্তমান তৃণমূল সরকারের কেউ কোনও প্রতিবাদ করেনি। সম্ভবত আগামী নির্বাচনে ধর্ষকদের ভোট আবার যদি না জোটে, এই ভয়ে।

রেজ্জাক মোল্লা বলেছেন, পুরুষের ‘কুনজর’ থেকে বাঁচতে    মেয়েদের শপিং মলে যাওয়া বন্ধ করা উচিত। রেজ্জাক কিন্তু পুরুষদের উপদেশ দেননি  তাদের  ‘কুনজর’ বন্ধ করার   জন্য।   সম্ভবত এতদিনে তিনি বুঝে গেছেন পুরুষ-জাতটা খারাপ। তো এই খারাপ-জাতকে ভালো করার তাঁর মোটেও ইচ্ছে নেই। বরং ভালো-জাত নারী-জাতকে উপদেশ দিয়েছেন খারাপ-জাত থেকে গা বাঁচিয়ে চলার জন্য। মোল্লার  বিবৃতি  যত না নারীবিরোধী, তার চেয়ে বেশি পুরুষবিরোধী। তিনি পুরুষদের ভালো মানুষ বলে মনে   করেন না।      পুরুষেরা নিজের যৌনইচ্ছেকে   সংযত করতে পারে  বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তাদের ‘কুনজর’কে সুনজর করার কোনও উপায় আছে বলে তিনি  মানেন না।   পুরুষবিরোধীরা যেমন পুরুষকে শুধুই  কামুক, শুধুই লম্পট, শুধুই ধর্ষক,  লিঙ্গসর্বস্ব,  শুধুই অসৎ,  অবিবেচক     বলে মনে করে, রেজ্জাক মোল্লাও তেমন মনে করেন। এই পুরুষবিরোধীরাই পুরুষের ‘কুনজর’ থেকে বাঁচতে মেয়েদের বোরখা পরার উপদেশ দেয়। 

খাপ পঞ্চায়েতের   মোড়লদের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রেজ্জাক মোল্লার কোনও পার্থক্য নেই। পার্থক্য হিন্দু মুসলমানেও   নেই। মেয়েদের অপদস্থ আর  অপমান  করতে, মেয়েদের অসম্মান করতে, অত্যাচার নির্যাতন করতে  দুই    সম্প্রদায়ই  সমান  পারদর্শি। যখন তাঁর বক্তব্যের নিন্দা হচ্ছে খুব, রেজ্জাক মোল্লা  বললেন যে তিনি যা বলেছেন মুসলমান মেয়েদের  সম্পর্কে বলেছেন, অমুসলমান মেয়েদের সম্পর্কে কিছুই বলেননি। বেফাঁস মন্তব্য করে, বেগতিক দেখে,  এখন নিজের ধর্মের গুহায় আশ্রয় নিয়েছেন। ধর্মের গুহা সবসময়ই খুব নিরাপদ কি না।  মুসলমান মেয়েদের সম্পর্কে বলেছেন  কারণ নিশ্চয়ই তিনি মনে করেন  মুসলমান মেয়েদের নিয়ে যা কিছু মন্তব্য করার অধিকার তাঁর আছে। আজ তাদের সালোয়ার কামিজ পরার উপদেশ দিচ্ছেন, কাল তাদের বোরখা পরার উপদেশ দেবেন। ‘অর্ধেক আকাশ’কে কালো মেঘে ঢেকে দিতে তাঁর কোনও আপত্তি নেই।

  সিপিআইএম-এর  চরিত্র  বলে এখন আর কিছু নেই। আমার মতো একজন ধর্মমুক্ত   মানববাদী  লেখককে রাজ্য থেকে দূর দূর করে যারা তাড়াতে পারে,   তারা  ধর্মীয় মৌলবাদীদের সঙ্গে একই সুরে কথা বলবে,  অবাক হওয়ার কী আছে!  মেয়েদের যৌন হেনস্থার জন্য  মেয়েদের     পোশাককে দায়ি করা মানে মেয়েদের   পছন্দ  মতো কাপড় চোপড়  পরার স্বাধীনতাকে   ধর্ষণ করা। সত্যি কথা বলতে, সেদিন রেজ্জাক মোল্লা মেয়েদের স্বাধীনতা আর অধিকারকে জনসমক্ষে ধর্ষণ করেছেন। 
'নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার অভিযানে' নেমে রেজ্জাক মোল্লা বলছেন,  'এখন যারা প্যান্ট-গেঞ্জি-টপ পরছে তারা গোল্লায় যাক৷ আপনারা সালোয়ারের উপরে উঠবেন না৷ এই বিষয়গুলি টেনে না ধরলে বিপদ৷ আমরা বাড়ির দুই মেয়ের একজন ডবলিউবিসিএস এবং একজন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার৷ তাদের দু'জনকে সালোয়ার-কামিজের মধ্যে ধরে রেখেছি৷'   তিনি তাঁর কন্যাদের সালোয়ার-কামিজের মধ্য ধরে রেখেছেন, এর মানে তাঁর   কন্যাদের   অধিকার নেই তাদের  পছন্দের  পোশাক পরার।  কারণ  তিনি  মেয়েদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস  করেন না। পুরুষ সিদ্ধান্ত নেবে মেয়েরা কী পোশাক পরবে। এসব বলে  কমিউনিস্ট নেতা  আরও স্পষ্ট করলেন যে তিনি নিজ বাসভূমে এক  উৎকট    পিতৃতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র     বহাল রেখেছেন।  এ কম লজ্জার নয়। তার ওপর আবার কতটুকু নির্লজ্জ হলে   রাজ্যের    বা দেশের মেয়েরা  কী পোশাক পরবে, তা নির্ধারণ করতে নামেন! কোন পোশাক শালীন, কোন পোশাক শালীন নয় তাও বেশ ঘোষণা করে দেন।  মেয়েদের বেলায় শুধু শালীনতা অশালীনতার প্রশ্ন ওঠে কেন!  তিনি তো কোনও  পুরুষের কোন  পোশাক   শালীন, কোন পোশাক অশালীন তা বলেন না! তাঁর বাড়ির   বা পাড়ার পুরুষেরা  খালি গায়ে  লুঙ্গি   বা গামছা পরে তার চোখের সামনে প্রতিদিন হাঁটাহাঁটি   করে না! তিনি নিজেও নিশ্চয়ই করেন। কখনও কি মনে হয়েছে লুঙ্গি শালীন পোশাক নয়, খালি গা শালীন নয়, গামছা পরা  অশ্লীল?  যে কারণে একটি মেয়ের জিনসকে তিনি অশালীন বলছেন, সে কারণে একটি ছেলের জিনসকে তিনি অশালীন বলছেন না কেন? যে কারণে একটি মেয়ের টিসার্ট  অশালীন, সে কারণে একটি ছেলের টি শার্ট কেন অশালীন নয়? শালীনতার সংজ্ঞা তৈরি করার দায়িত্বটি কার?  পুরুষের? রেজ্জাক মোল্লাদের?  

আধুনিক পোশাকের বদলে রবীন্দ্র-যুগের ঠাকুরবাড়ির পোশাকের পক্ষপাতী   রেজ্জাক মোল্লা।  বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের আমলে যে ড্রেস-কোড ছিল তা সঠিক বলে মনে করি৷ রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে মেয়েরা শাড়ির সঙ্গে লম্বা হাতের ব্লাউজ পরতেন, কেউ কেউ মাথায় ঘোমটাও দিতেন।  সেই পোশাকই  রেজ্জাক  চাইছেন এখনকার  মেয়েরা পরুক। আধুনিক  মেয়েরা ফিরে যাক উনবিংশ শতাব্দির পোশাকে।

শাড়ির প্রতি  হিন্দু হোক মুসলিম হোক, পশ্চিমবঙ্গের সব রক্ষণশীল মানুষেরই পক্ষপাত।    ইস্কুলের শিক্ষিকাদের ক’দিন পর পরই ড্রেস কোড দেওয়া হয়, সালোয়ার কামিজ চলবে না, সবাইকে শাড়ি পরতে হবে। অশালীন  বলতে    যদি শরীরের ত্বক  প্রকাশ হওয়াকে বোঝানো হয়, তবে শাড়ি সবচেয়ে অশালীন পোশাক। এবং সবচেয়ে শালীন পোশাক প্যান্ট-সার্ট।  শাড়ি পরে দৌড়ঝাঁপ করা, দৌড়ে বাসে ট্রামে ট্রেনে ওঠা ঝামেলা, শাড়িতে টান পড়লে  শাড়ি খুলে পড়বে।   শাড়ি ভারতীয় উপমহাদেশের   আদি পোশাক।   আমাদের পূর্বনারীরা যখন শাড়ি পরতেন, তখন  কিন্তু  সঙ্গে সায়া-ব্লাউজ   পরতেন না। সে নিশ্চয়ই  ‘অশালীনতার’ চূড়ান্ত। সবকিছুর বিবর্তন হয়, কাপড় চোপড়েরও। বিবর্তনে যাদের বিশ্বাস নেই, তারা হাতের কাছে যা পায়, তা-ই  আঁকড়ে ধরে, তা নিয়েই অনন্তকাল কাটিয়ে দিতে চায়।
রেজ্জাকের  বক্তব্য, 'লেখাপড়া করা মানে প্যান্ট-টপ পরতে হবে এমন নয়, আপনারা শপিং মলের মতো জায়গায় যাবেন না৷’ কমিউনিস্ট নেতা মৌলবাদী নেতার মতো কথা বলছেন, মেয়েরা কী পরবে না,   কোথায় যাবে না,  তা বলে দিচ্ছেন। এর অন্যথা হলে বিপদ হবে, তারও হুমকি দিচ্ছেন।   মেয়েদের শুধু পুরুষের  সম্পত্তি  নয়,  এই সমাজেরও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে বিশ্বাস করা হয়।    সে  কারণে  সমাজের লোকেরা  একটা মেয়ে কী পরলো, কী করলো, কোথায় গেল, কী খেলো, কার সঙ্গে কথা বললো, কার সঙ্গে শুলো, কখন বাড়ি ফিরলো এসবের খবরাখবর রাখে।  লক্ষ্মণরেখা পেরোলেই সর্বনাশ। সমাজের লোকেরাই   সিদ্ধান্ত নেবে মেয়েকে একঘরে করতে হবে নাকি পাথর ছুঁড়ে মারতে হবে। মেয়েদের শরীরকে অর্থাৎ  মেয়েদের যৌনতাকে শেকল দিয়ে বেঁধে ফেলার আরেক নাম পুরুষতন্ত্র। এই শেকল যতদিন না ভাঙা হবে, ততদিন মেয়েদের সত্যিকার মুক্তি নেই,  ততদিন তাদের পোশাক আশাক আর তাদের চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকবে।


রেজ্জাক মোল্লা আমাদের এই  পুরুষতান্ত্রিক নারীবিরোধী সমাজের যোগ্য প্রতিনিধি। তিনি আজ  পুরুষদের একরকম আহবানই জানালেন   টপ জিনস পরা মেয়েদের ধর্ষণ করার জন্য।  বলেছেন টপ জিনস পরা   ধর্ষিতারা যেন ধর্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না করে,    কারণ   ধর্ষিতারা নিজেদের ধর্ষণের জন্য দায়ী, ধর্ষকরা নয়।    এখন পঙ্গপালের মতো  পুরুষেরা  নেমে পড়বে রাস্তা-ঘাটে ঘরে-বাইরে শপিং মলে,  নির্দ্বিধায় নিশ্চিন্তে মেয়েদের ধর্ষণ করবে।  রাজনীতির হর্তা কর্তাদের সম্মতি পেলে কে বসে থাকে!

মূর্খ রাজনীতিবিদরা সমাজকে যত নষ্ট করে, তত নষ্ট সম্ভবত ধর্ষকরাও করে না। ধর্ষকদের দোষ দিয়ে ধর্ষণের মূল কারণকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়। ধর্ষক  হয়ে কেউ জন্মায় না। এই পুরুষতন্ত্র, পিতৃতন্ত্র,   সমাজের কুশিক্ষা, ভুল-শিক্ষা, নারী-বিদ্বেষ, নারী-ঘৃণা   পুরুষকে ধর্ষক বানায়। ধর্ষিতাকে দোষ দিয়ে ধর্ষণ বন্ধ করা যায় না। ধর্ষককে ফাঁসি দিয়েও ধর্ষণ বন্ধ করা যায় না।    ধর্ষণের মূল কারণগুলোকে নির্মুল করতে পারলেই ধর্ষণ বন্ধ হবে।

শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, বাংলাদেশেও একই অবস্থা। বাংলাদেশের সমাজেও    রেজ্জাক মোল্লাদের অভাব নেই। এঁরা শিক্ষিত পরিবারের  শিক্ষিত লোক। কিন্তু মেয়েদের যৌনবস্তু ছাড়া আর কিছু ভাবতে এরা পারেন না।   নারীবাদীদের শত বছরের আন্দোলনের ফলে পৃথিবীতে নারী-শিক্ষা  শুরু হয়েছে, নারীরা ভোটের অধিকার পেয়েছে,   বাইরে বেরোবার এবং স্বনির্ভর হওয়ার অধিকার পেয়েছে, কিন্তু এই অধিকারই সব নয়, নারীর যে অধিকারটি নেই এবং যে অধিকারটি সবচেয়ে মূল্যবান , সেটি নারীর শরীরের ওপর নারীর অধিকার। নারীর  শরীরকে সমাজের এবং পরিবারের দাসত্ব থেকে  মুক্ত করা অত্যন্ত  জরুরি । নারীর শরীর  কোনও  সমাজের সম্পত্তি, বা কোনও পরিবারের সম্মানের বস্তু নয়।  যতদিন    নারী তার শরীরের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা না পাচ্ছে, নারীর শরীর নিয়ে নারী কী করবে, সেই সিদ্ধান্ত নারীর না হবে, যতদিন এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার  পুরুষের, আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের, ততদিন নারীর সত্যিকার মুক্তি সম্ভব নয়। আর যতদিন এই মুক্তি সম্ভব নয়, ততদিন নারীর পরিচয় পুরুষের ‘ভোগের  বস্তু’ হয়েই থাকবে-- ঘরে, পতিতালয়ে, রাস্তায়,  অফিসে, বাসে, ট্রেনে--সবখানে। ভোগের বস্তু নারীকে ভাবা হয় বলেই যৌন হেনস্থা  বা  ধর্ষণের মতো ঘৃন্য অপরাধ ঘটাতে পুরুষের কোনও অসুবিধে হয় না।    পুরুষাঙ্গ মেয়েদের ধর্ষণ করে না, ধর্ষণ করে ঘৃণ্য পুরুষিক মানসিকতা। পুরুষাঙ্গ নিতান্তই একটা ক্ষুদ্র নিরীহ  অঙ্গ। পুরুষিক  মানসিকতা দূর করলে পুরুষেরা  নারীকে যৌনবস্তু হিসেবে না দেখে একই প্রজাতির সহযাত্রী সতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে দেখবে। পুরুষের  যৌনইচ্ছের চেয়ে নারীর     যৌনইচ্ছে  কিছু কম নয়। নারী যদি নিজের যৌনইচ্ছে সংযত করতে পারে, পুরুষের বিনা অনুমতিতে পুরুষকে স্পর্শ না করে  থাকতে পারে,   পুরুষ কেন পারবে না, পুরুষ কেন চাইলে নারীর বিনা অনুমতিতে নারীকে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে না!   মানুষ মাত্রই  এই ইচ্ছেকে সংযত করতে পারে, কিন্তু ধর্ষকদের  মধ্যে সংযত করার এই  চেষ্টাটা  নেই, কারণ ধর্ষকদের মস্তিস্কের গভীরে   পুরুষতান্ত্রিক  সমাজের শিক্ষাটা  অনেক আগেই  ঢুকে গেছে যে  নারী  যৌনবস্তু আর    পুরুষের অধিকার আছে  যখন খুশি যেভাবে খুশি  যৌনবস্তুকে ভোগ করা।    কিন্তু কে কাকে বোঝাবে যে     নারী ও পুরুষের সম্পর্ক  যদি  খাদ্য ও খাদকের বা  শিকার ও  শিকারীর হয়, তবে এ কোনও     সুস্থ সম্পর্ক নয়!  কোনও  বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে কখনও  সুস্থ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না।  নারী তার সমানাধিকার না পাওয়া পর্যন্ত নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনও সত্যিকার সুস্থ সম্পর্ক গড়ে উঠবে না। সমানাধিকার কে দেবে নারীকে? যারা ছিনিয়ে নিয়েছে,   তাদের দায়িত্ব নারীর অধিকার নারীকে ভালোয় ভালোয় ফিরিয়ে দেওয়া।